অপচয় ও চুরি রোধে আবাসিক গ্যাস ব্যবহারকারী গ্রাহকদের গ্যাসের পরিমাণ যাচাই করা হচ্ছে । তিতাসের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে আবাসিক গ্রাহকরা নির্দিষ্ট পরিমাণের বাইরে গ্যাস ব্যবহার করছে। এমন কি গ্যাসের অহরহ অপচয় করছে। গ্রাহকদের এমন কার্যক্রমে গ্যাস সংকট আরো তরান্বিত হচ্ছে। মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকের গ্যাসের ব্যবহার নিয়ে চলা বিতর্কের অবসান আশা করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এর অংশ হিসেবে এলোপাথাড়ি (দৈবচয়ন) যাচাইয়ের ভিত্তিতে দুই হাজার প্রিপেইড মিটার বসিয়ে আবাসিক গ্রাহকের গ্যাসের পরিমাণ যাচাই করা হবে। ওই সমীক্ষার কাজটি করবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। বুয়েটের দেয়া সেই রিপোর্টের মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সম্প্রতি বিইআরসির কমিশনের বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকের নির্ধারিত পরিমাণ গ্যাসের বিল আদায় করা হয়। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এক চুলা ৫৫ ঘনমিটার (৯৯০ টাকা) থেকে বাড়িয়ে ৭৬.৬৫ ঘনমিটার দুই চুলা ৬০ ঘনমিটার (১০৮০ টাকা) থেকে বাড়িয়ে ৮৮.৪৪ ঘনমিটার (১৫৯১ টাকা) করার আবেদন দিয়েছে। যদিও দাম বৃদ্ধির বিষয়টি এখনো কার্যকর হয়নি। মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকরা বেশি ব্যবহার করছে। সে কারণে তাদের সিস্টেম লস বেড়ে যাচ্ছে বলে দাবি করে আসছে তিতাস গ্যাস।

তিতাসের ওই আবেদনটি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) জমা হয় ২০২৩ সালের মার্চের দিকে। তারপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে দড়ি টানাটানি চলছে। বিইআরসি একটি অভ্যন্তরীণ কমিটির মাধ্যমেও কোন সিদ্ধান্ত আসতে পারেনি। বিইআরসি, পেট্রোবাংলা ও তিতাসের যৌথসভায় তৃতীয়পক্ষের মাধ্যমে সার্ভে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গবেষণা তহবিলের অর্থায়নে কাজটি দেওয়া হয়েছে বুয়েটকে।

সূত্র জানায়, সারাদেশে প্রায় ৪৪ লাখ আবাসিক গ্রাহক রয়েছে, তার মধ্যে ৫ লাখের মতো প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করেন। বেশিরভাগ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে গড়ে ৩০ ঘনমিটারের কম গ্যাস ব্যবহার করছেন প্রিপেইড গ্রাহকরা। শুধু সেই পরিসংখ্যান নয়, ২০১৯ সালে বিআইডিএসকে (বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান) দিয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে বিইআরসি। মূল লক্ষ্য ছিল আবাসিকে প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারি ও মিটার বিহীন গ্রাহকদের উপর সমীক্ষা পরিচালনা করা। রিপোর্টে দেশের ৬টি কোম্পানির গ্রাহকের উপর জরিপ পরিচালনা করা হয়।

১৩ জেলার ১০৫৪ আবাসিক গ্রাহকের উপর পরিচালিত সমীক্ষার রিপোর্টে বলা হয়েছে, একক চুলার প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারি গ্রাহকরা ৩৫.৫ ঘনমিটার ও দুই চুলার গ্রাহকরা ৫৯.৩ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করছে। গড়ে ৫৭.৯ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেছেন মিটার ব্যবহারকারিরা। আর ননমিটার গ্রাহকরা গড়ে ৫৬ মিটার গ্যাস ব্যবহার করেছেন। তিতাস গ্যাস ওই রিপোর্টের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আসছে। তিতাস বলেছে, মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকরা অনেক বেশি গ্যাস ব্যবহার করছে। ক্ষেত্র বিশেষে ১০০ ঘনমিটার পর্যন্ত গ্যাস ব্যবহারের রেকর্ড পাওয়া গেছে।

তিতাসের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারি ও ননমিটার গ্রাহকের ব্যবহারের মধ্যে অনেক তারতম্য রয়েছে। প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারি গ্রাহক অনেকটা মিতব্যায়ী হন। তাই তাদের ব্যবহারের পরিমাণ অনেক কম হয়ে থাকে।

বিইআরসি সর্বশেষ গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আদেশ দেয় ২০২২ সালের ৫ জুন। ওই আদেশের পূর্বে গণশুনানি গ্রহণ করে। তখন বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারি গ্রাহকদের পরিসংখ্যানে দেখা যায় গড়ে এক চুলা ৪০ এবং দুই চুলা সর্বোচ্চ ৫০ ঘনমিটার ব্যবহার করছে। প্রিপেইড গ্রাহকের ব্যবহারের পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করে এক চুলা ৭৩.৪১ ঘনমিটার ও দুই চুলা ৭৭.৪১ ঘনমিটার থেকে কমিয়ে যথাক্রমে ৫৫ ও ৬০ ঘনমিটার করা হয়।

জ¦ালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিতাস গ্যাসের দাবি সত্য নয়। আমাদের তো মনে হয় ৫০ ঘনমিটারের নিচে করা উচিত ছিল। তাদের যে সাড়ে ৩ লাখ প্রিপেইড মিটার ছিল (ওই সময়) সেখানে দেখা গেছে গড়ে ৪৫ ঘনমিটারের কম ব্যবহৃত হয়েছে। প্রিপেইড মিটারের বিলের তথ্য দেখলেই বুঝতে পারা যায়। বিষয়টির জন্য রকেট সায়েন্স জানা দরকার হয় না।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান , আমরা আশা করছি বুয়েটের পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান আসবে। তারা দৈবচয়ন ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় গ্রাহক নির্বাচন করবে। এতে মৌসুম ভেদেও গ্রাহকের গ্যাস ব্যবহারের বিষয়টি তুলে আনবে। তার পরেই এই বিতর্কের অবসান হবে বলে আশা করছি।