রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মা-মেয়ে হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশের ধারণা, এই হত্যাকাণ্ডে বাসার গৃহকর্মী (২০) জড়িত। ঘটনার পর থেকে ওই গৃহকর্মী পলাতক। এ ঘটনায় গতকাল থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। পুলিশ বলছে-গৃহকর্মীর ঠিকানা ও তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চেষ্টা চলছে। ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে যাচাই বছাই করা হচ্ছে। এছাড়াও মেয়েটি অন্য কোথাও কাজ করছে কিনা বা তার আত্মীয় স্বজন কারা এ বিষয়ে পুলিশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সংস্থাও কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামতের রাসয়নিক পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সোমবার দুপুরের দিকে মোহাম্মদপুরের একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট থেকে মা-মেয়ের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তারা হলেন-লায়লা আফরোজ (৪৮) ও তার মেয়ে নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিজ (১৫)। নাফিসা মোহাম্মদপুরের প্রিপারেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তার বাবা আজিজুল ইসলাম রাজধানীর একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। গতকাল মঙ্গলবার মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন বলেন, গৃহকর্মীর পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে।
ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, ওই গৃহকর্মী বোরকা পরে বাসায় এসেছিলেন। আর বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার পরনে ছিল নিহত নাফিসার স্কুলড্রেস। নাফিসার গলায় একাধিক গভীর ক্ষত এবং লায়লার শরীরে অনেকগুলো আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পুলিশের ধারণা, হাতে গ্লাভস পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মা-মেয়েকে আঘাত করা হয়েছে। বাসার একটি আলমারির জিনিসপত্র এলোমেলো পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় মো. খালেক নামে ভবনটির একজন নিরাপত্তাকর্মীকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা জানায় পুলিশ। পারিবারিক সূত্র জানায়, আজিজুল ইসলাম সকালে স্কুলে গিয়েছিলেন। তিনি বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাসায় এসে স্ত্রী-সন্তানের মরদেহ দেখতে পান। আজিজুল ইসলাম জানান, ভবনের তত্ত্বাবধায়ক ও নিরাপত্তাকর্মীদের মাধ্যমে চার দিন আগে ওই গৃহকর্মীকে কাজে নেন। আজিজুল বলেন, মেয়েটির (গৃহকর্মী) পরিচয় ও ফোন নম্বর চেয়েছিলাম। কিন্তু সে বলেছিল, আগুনে পুড়ে তার মা-বাবা মারা গেছে। সে-ও আগুনে দগ্ধ হয়েছিল। এসব বলে পরিচয় ও ফোন নম্বর দেয়নি।
এদিকে, এ জোড়া খুনের ঘটনায় আজিজুল ইসলাম বাদী হয়ে কথিত গৃহকর্মী মোছা. আয়েশাকে (২০) আসামী করা হয়েছে। বিকেলেএ তথ্য নিশ্চিত করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের মোহাম্মদপুর অঞ্চলের সহকারী কমিশনার আবদুল্লাহ আল মামুন। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, গতকাল (সোমবার) সকাল ৭টা ৫১ মিনিট থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে যেকোনো সময় এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। মামলায় বাদী আজিজুল লিখেছেন, তিনি পেশায় একজন শিক্ষক। মোহাম্মদপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন। চার দিন আগে উল্লিখিত আসামী তার বাসায় খণ্ডকালীন গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সোমবার সকাল ৭টার দিকে তিনি (আজিজুল) তার কর্মস্থল উত্তরায় চলে যান। কর্মস্থলে থাকাকালে তিনি তার স্ত্রীর মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে তিনি বেলা ১১টার দিকে বাসায় আসেন। এসে দেখতে পান, তার স্ত্রীর গলাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাটা। স্ত্রী রক্তাক্ত-জখম হয়ে মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন। আর মেয়ের গলার নিচে ডান পাশে কাটা। মেয়ে গুরুতর অবস্থায় বাসার প্রধান ফটকে পড়ে আছে। মেয়ের এই অবস্থা দেখে তিনি দ্রুত তাকে উদ্ধার করেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী আশিকের মাধ্যমে মেয়েকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
মামলায় আজিজুল আরও লিখেছেন, তিনি বাসার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করেন। এতে তিনি দেখতে পান, আসামি সকাল ৭টা ৫১ মিনিটের সময় কাজ করার জন্য বাসায় আসেন। সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটের সময় আসামি তার মেয়ের স্কুল ড্রেস পরে বাসা থেকে পালিয়ে যান। যাওয়ার সময় একটি মোবাইল, একটি ল্যাপটপ, স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থসহ অন্যান্য মূলবান সামগ্রী নিয়ে যান আসামি। মামলায় বাদী লিখেছেন, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তিনি নিশ্চিত হন যে, অজ্ঞাত কারণে আসামি তার স্ত্রী ও মেয়েকে ছুরি বা অন্য কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে গুরুতর জখম করে হত্যা করেন।
মা-মেয়েকে নিজ এলাকায় দাফন : মোহাম্মদপুরে নিজ বাসায় নৃশংসভাবে খুন হওয়া লায়লা আফরোজ ও তার মেয়ে নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিজের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার বাদ জোহর নাটোর শহরের গাড়ীখানা কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। এর আগে শহরের নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সরকারি কলেজ মাঠে মা ও মেয়ের জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আহতদের স্বজনসহ এলাকার সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেয়।