ব্যাংক রেজুলেশন আইন-২০২৬ এ একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকের পুরনো শেয়ারধারীদের কোনো ধরনের জবাবদিহিতা ব্যতিরেকে আবারও ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার সুযোগের বিধান যুক্ত করার মাধ্যমে সরকার চিহ্নিত লুটেরাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, এর ফলে ব্যাংকিং খাত পুনরায় দুর্নীতি ও লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে, যা আত্মঘাতীমূলক বলেও জানিয়েছে টিআইবি।
এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও সুশাসনের ঘাটতি দূর করার পরিবর্তে দায়মুক্তি ও বিচারহীনতার পূর্ববর্তী কর্তৃত্ববাদী চর্চা অব্যাহত রাখা হয়েছে বলেও মনে করে সংস্থাটি। গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে এসব কথা জানিয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকার যে যুক্তিই দেখাক না কেন, দুর্নীতি ও লুটপাট সহায়ক ও সুরক্ষাকারী এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাস্তবে ব্যাংক খাতের লুটেরাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা দূরে থাক, বিশালভাবে পুরস্কৃত করা হলো, যা আত্মঘাতীমূলক। সরকারের এ সিদ্ধান্ত হতাশাজনক হলেও অবাক করার মতো তেমন কিছু নেই।
তিনি আরও বলেন, কর্তৃত্ববাদের পতনের অর্থ যে ব্যাংক খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবরদখলের অবসান নয়, বরং “উইনার টেইকস অল” ফর্মুলায় নীতিদখলের পালাবদলের মাধ্যমে চোরতন্ত্রের সাময়িক বিরতির পর পুনর্বাসনের পথ সুগম রাখা, সরকারের এ পদক্ষেপ তারই দৃষ্টান্ত, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের চরম বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা মাত্র। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘সংকটে নিমজ্জিত ব্যাংকগুলোর আগের মালিকরা যারা এ খাতের লুটপাটের পাইওনিয়ার, তারাই বা কোন যাদুবলে এমন শুদ্ধতা অর্জন করলেন যে, তারা একই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ইত্যাদি পুনরায় করায়ত্তের জন্য সরকার নির্ধারিত অর্থের মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ জমা দিবেন, বাকি ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ দুই বছরে মাত্র ১০ শতাংশ সুদসহ শোধ করবেন! নতুন মূলধন যোগান দেবেন! বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণ করবেন! আগের সব আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় শোধ করবেন! সরকারের কর ও রাজস্ব পরিশোধ করবে! ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেবেন এবং সংশ্লিষ্ট নিয়মকানুনের কমপ্লায়েন্স কাঠামো পুনর্গঠন করবেন?’
তিনি বলেন, এ প্রশ্নের উত্তর কী সরকারের কাছে আছে! তাছাড়া কোন মানদণ্ডে পুনর্দখলের বিনিময় মূল্য নির্ধারিত হবে? অধিকন্তু ব্যাংক পুনর্দখলের পর ঘোষিত শর্তাবলী বাস্তবে প্রতিপালিত হবে, এমন নিশ্চয়তা স্বার্থের দ্বন্দ্বে দুষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে কীভাবে সম্ভব হবে, তা বোধগম্য নয়। না-কী বাস্তবে তথাকথিত শর্ত পূরণের নামে তারা স্বনির্ধারিত শর্তে নতুন করে ঋণ আদায় করে ঋণ খেলাপির চলমান স্বাভাবিকতার সুযোগ নিয়ে ব্যাংক খাতে গভীরতর দেউলিয়াপনার ফ্লাডগেইট উন্মোচন করবে? যার বোঝা জনগণকে বইতে হবে! যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের জন্য দায়ী পুরনো শেয়ার হোল্ডারদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে ঢালাওভাবে মালিকানা ফিরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হলে এ খাতে গুণগত কোনো পরিবর্তন আসবে না বলে উল্লেখ করেছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকার ব্যাংক সচল রাখা, আমানত সুরক্ষা ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার নামে দুর্নীতিসহায়ক নতুন বিধান যুক্ত করে সংখ্যাগরিষ্ঠার জোরে যে আইনটি সংসদে পাস করেছে, তা কী আদৌ ক্ষমতাসীন দল তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানখাত সংস্কারের যে অঙ্গীকার করেছে, তা প্রতিপালনে সহায়ক হবে! না-কী সুবিধাবাদী গোষ্ঠীতন্ত্রের স্বার্থরক্ষায় এ জাতীয় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে! এ ব্যাপারে সরকারকে পুনরায় ভেবে দেখার অনুরোধ করছি।