অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, কিছু মানুষের কাছে সংস্কার নিয়ে নেতিবাচক কথা বলাটা যেন উদ্দীপকের মতো কাজ করে। এতে বাড়তি ভিউ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, কোনো সংস্কারই হয়নি এ কথা ঠিক নয়। যথেষ্ট সংস্কার হয়েছে। প্রত্যাশা যদি ১০ ধরা হয়, অন্তত চার অর্জন করা গেছে। তবে পুলিশ সংস্কার যেভাবে করতে চেয়েছি, সেভাবে হয়নি।
গতকাল রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন শীর্ষক নীতি সংলাপে এসব কথা বলেন আসিফ নজরুল। আইন উপদেষ্টা বলেন, সংস্কার প্রক্রিয়ায় সবার সঙ্গে বিস্তৃত পরামর্শ করা হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের সময়ও এমন পরামর্শ হয়েছিল। তিনি বলেন, শুধু ১০ বছর জয় বাংলা বা বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বললেই বিচারক হওয়া যাবে না। উচ্চ আদালতেও কিছু সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে, আর সেই সংস্কার উচ্চ আদালত থেকেই আসবে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, এ জন্য প্রয়োজনীয় সব আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আরও পাঁচ থেকে দশ বছর সময় লাগতে পারে। আমরা সংস্কারের পথে এগিয়েছি। নির্বাচিত সরকার যদি এই ধারা বজায় রাখে, তাহলে জনগণ এর সুফল পাবে। আসিফ নজরুল বলেন, কিছু মানুষের কাছে সংস্কার নিয়ে নেতিবাচক কথা উদ্দীপকের মতো। বাড়তি ভিউ পাওয়া যায়। কোনো সংস্কার হয় নাই, এটা ঠিক নয়। এক্সপেকটেশন যদি ১০ থাকে, অন্তত ৪ তো অর্জন করতে পেরেছি। তবে পুলিশ সংস্কার যেভাবে করতে চেয়েছি, সেভাবে হয়নি। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য যা যা আইন করা দরকার, সবই আমরা করেছি। এর ধারাবাহিকতায় রুল অব ল প্রতিষ্ঠায় আরও ৫/১০ বছর লাগবে। নির্বাচিত সরকার এ ধারা ধরে রাখলে জনগণ সংস্কারের সুফল পাবে। আগামীতে ‘রুল অব ল’ প্রতিষ্ঠা হবে কি না জানি না, তবে জবাবদিহিতা ছাড়া অসীম স্বাধীনতা সুফল বয়ে আনে না। এজন্য উচ্চ আদালতেও কিছু সংস্কার দরকার।
তিনি বলেন, গণভবনের পতনের যে আন্দোলন, তার সঙ্গে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর কেউ যদি রাস্তায় ছিনতাইকারী অথবা কোনো ধর্মীয় সংখ্যালঘু পিটিয়ে হত্যা করে, দুটোকে একসঙ্গে বিচার করা যাবে না। ‘মব’ শব্দটা প্রয়োগের আগে অবশ্যই খুব সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। ‘মব’ শব্দটি বলার পেছনে বিপ্লবকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটা মানসিকতা কাজ করে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তাই ‘মব’ শব্দটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করার কথা বলেছেন তিনি।
তাজুল ইসলামের এমন বক্তব্যের পর একাধিক বক্তা তাঁর বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন। এমন বক্তব্যকে ‘থ্রেট’ হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ।
সংলাপের সূচনা বক্তব্য দিতে গিয়ে সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করীম আব্বাসি বলেন, এখন বিচার বিভাগের নয়, মবোক্রেসির রুল দেখা যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়াল হচ্ছে। পরিস্থিতি যদি এমন থাকে যে তথাকথিত তৌহিদি জনতা আইন নিজের হাতে নিতে পারে এবং দোষীদের শাস্তি দিতে গড়িমসি চলে, তখন আইনের শাসন নিশ্চিত করতে যত প্রতীকী ব্যবস্থাই নেওয়া হোক, তা যথেষ্ট নয়। আইনের শাসন নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘বিপ্লবের আগে–পরে যেকোনো সময় ইনজাস্টিসকে অ্যালাউ করলে সেটা বাউন্স ব্যাক করবেই।ৃমবকে অ্যালাউ করা হয়েছিল, এখন মব সরকারকে খেয়ে ফেলছে। নির্বাচন কমিশনকে খেয়ে ফেলছে। দেশকেও খেয়ে ফেলতে পারে।’
সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান বলেন, ‘এই টেবিলে বসেই সরকারের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলেছিলেন “মব বলে কিছু নেই, এরা হচ্ছে প্রেশার গ্রুপ”...এই জাস্টিফিকেশন দাঁড় করানোর কয়েক দিন পর আমরা দেখলাম, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার তারপর দেখলাম তাঁরা আর মব নিয়ে কথা বলছেন না। এখন আবার যখন তাঁরা মবের পক্ষে কথা বলতে শুরু করেছেন, আমরা আশঙ্কা করছি, অচিরেই হয়তো আমাদের ওই রকম কিছু ঘটনা বা দুর্ঘটনা দেখতে হতে পারে।