যুক্তরাজ্যের লন্ডনে নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর বাংলাদেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে তাকে বহনকারী বিমানটি। দেড় যুগের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে দেশে ফিরছেন স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান এবং কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। তার এই দেশে ফেরার খবর গুরুত্বের সাথে প্রচার করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। তারেক রহমানের এ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের খবর বেশ ফলাও করে প্রচার করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি, আল জাজিরা, মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য স্ট্রেইট টাইমস, ভারতীয় সংবাদপত্র দ্য উইক, ইন্ডিয়া টুডে, টিআরটি ওয়ার্ল্ড, ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স, ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি। এছাড়াও বিশ্বের আরব নিউজ, ডন, জিও নিউজের মতো আরও অনেক গণমাধ্যমে তারেক রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের খবর প্রকাশ করা হয়েছে। গণমাধ্যমগুলোর বিবরণে, তারেক রহমানের এই ফেরাকে বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন সূচনা হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি লিখেছে, “বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা শীর্ষ নেতা ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন।” আরেক ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্সও বলেছে, বাংলাদেশের নির্বাচন সামনে রেখে দেশে ফিরছেন বাংলাদেশের নেতা, যাকে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিবিসি বাংলার ওয়েবসাইটে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের খবর লাইভ প্রকাশ করা হয়। এর শিরোনাম ছিল-১৭ বছর পর ঢাকায় তারেক রহমান। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর আজ এসেছেন দেশের মাটিতে। তাকে ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বাগত জানান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির সিনিয়র নেতারা।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা তাদের শিরোনামে লিখেছে, “১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে বিরোধী দলীয় নেতা তারেক রহমান বাংলাদেশে ফিরেছেন।” তারেক রহমানের পরিচিতি এবং দেশে ফেরার পটভূমির পাশাপাশি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে আল জাজিরার এই প্রতিবেদনে। মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য স্ট্রেইট টাইমস লিখেছে, “প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য শীর্ষ নেতা হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশের নেতা নির্বাচনের আগে দেশে ফিরেছেন।” তুরস্কের গণমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অন্যতম দাবিদার তারেক রহামন দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন থেকে দেশে ফিরেছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে তারেক রহমানের ফেরার খবরের পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্লেষণ চলছে। তারা দাবি করছে, তারেক রহমানের বাংলাদেশে ফেরা ভারতের জন্য ভালো খবর। দ্য উইক তাদের শিরোনামে লিখেছে, “তারেক রহমানের ফেরা কি ভারতের জন্য ভালো খবর?” এরপর তারা এ নিয়ে নিজেদের বিশ্লেষণ দাঁড় করিয়েছে। ইন্ডিয়া টুডে তাদের শিরোনামে লিখেছে, “খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান দেশে ফিরেছেন। কেন এটি ভারতের জন্য ভালো খরব?” তারাও তাদের মতো করে খবরের বিশ্লেষণ করেছে। ভারতের গণমাধ্যম এনডিটিভি লিখেছে, ১৭ বছর পর স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে দেশে ফিরলেন তারেক রহমান। সাথে ফিরল তাদের পারিবারিক বিড়ালও। তারেক রহমান দেশে ফিরেছেন এবং এ উপলক্ষ্যে সারা দেশ থেকে নজিরবিহীন মানুষের ঢল নেমেছে, এমন বর্ণনা উঠে আসে এনডিটিভির প্রতিবেদনে। এর পাশাপাশি ২০০৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তারেক রহমানের বিষয়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এতে আলোচনা করা হয়। বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা পরিবারের উত্তরসূরি এবং সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের নেতা তারিক রহমান দেশে ফিরছেন, এমন বর্ণনা উঠে এসেছে প্রতিবেদনটিতে। তার মা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, তারেক জিয়া তার মায়ের থেকে বিএনপির দায়িত্ব বুঝে নেবেন এমন ধারণা করা হচ্ছে।

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি লিখেছে, দেশের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) ঢাকায় পৌঁছেছেন। ৬০ বছর বয়সি তারেক রহমান ২০০৮ সালে রাজনৈতিক নিপীড়নের পর দেশ ছেড়ে লন্ডনে বসবাস শুরু করেন।

এদিকে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় করে রাখতে এবং রাজকীয় সংবর্ধনা দিতে রাজধানীর ৩০০ ফিট (পূর্বাচল) এলাকায় তৈরি করা হয়েছে এক সুবিশাল মঞ্চ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই মঞ্চ এলাকায় লাখ লাখ নেতাকর্মীর সমাগম ঘটেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কের গণসংবর্ধনা মঞ্চে তারেক রহমান বলেন, সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব আমরা, যা একজন মা দেখেন। অর্থাৎ একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই। যে বাংলাদেশে একজন মানুষ নিরাপদে ঘর থেকে বের হতে পারে ও ঘরে ফিরে আসতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের সময় এসেছে সকলে মিলে দেশ গড়ার। এ দেশে পাহাড়ের, সমতলের, মুসলমান, হিন্দু বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই আছে। আমরা নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। যে বাংলাদেশে একজন নারী, পুরুষ, শিশু যেই হোক না কেন নিরাপদে ঘর থেকে বের হলে, যেন নিরাপদে ফিরতে পারে। বক্তব্যের শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘সবাই মিলে করব কাজ, গড়ব মোদের বাংলাদেশ।’ তিনি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।