বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, চলুন জনগণের চোখের পানি মুছে ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটানোর রাজনীতি করি। চলুন বাংলাদেশ একসাথে গড়ি। তিনি বলেন আমাদের সন্তান ও নাতি-নাতনির জন্য শান্তির বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই। গতকাল মঙ্গলবার হোটেল ইন্টার কন্টিনেনটালে পলিসি সামিটের সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন।
প্রশ্ন রেখে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা নাতি নাতনির কাছে কোন বাংলাদেশ রেখে যাবো। আমাদের কাছে জবাব নেই। আমি যুবকদের বলবো তোমাদের কাজ শেষ হয়নি। তোমরা যাস্ট স্বৈরাচারকে তাড়িয়েছো। কিন্তু স্বৈর মানুষ এদেশ থেকে যায়নি। এটাকে নির্মূল না করা পর্যন্ত কাজ শেষ হবে না। তিনি শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায় বিচার ঠিক করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, মূল ঠিক থাকলে সব ঠিক থাকবে। শিক্ষা হবে নৈতিকতা এবং কর্মমুখী। সব ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার ঠিক করা গেলে সবকিছু ঠিক হবে।
তিনি উল্লেখ করেন দুর্নীতিতে চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই দেশকে আমরা টেনে উঠাতে চাই। আমাদের আগামী প্রজন্মকে কথা দিতে চাই তোমাদের শান্তির বাংলাদেশে রেখে যেতে চাই। তিনি কথা দেন রাষ্ট্রের বৈধ সুযোগও গ্রহণ করবে না তার দলের লোকেরা। চলেন জনগণের চোখের পানি মুছে গিয়ে ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটাতেই রাজনীতি করি। চলেন একসাথে গড়ি বাংলাদেশ।
এর আগে সকালে একইস্থানে পলিসি সামিটের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একটি নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা লালন করি, তার পলিসি ও ভিশন আপনাদের সামনে তুলে ধরার জন্য আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি। আমাদের এই দেশ এমন একটি দেশ, যার জনগণ ইতিহাসের পরতে পরতে বারবার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে, আর প্রতিবারই আমরা জনগণ প্রমাণ করেছি আমরা কখনো ব্যর্থ হইনা। আমরা হতাশার বিপরীতে আশার, স্বৈরাচারের বিপরীতে গণতন্ত্র এবং বিচ্ছিন্নতার বিপরীতে অংশীদারিত্বে বিশ্বাসী একটি দেশ। সারাবিশ্ব অবগত, ২০২৪ সালে যা ‘মনসুন রেভোলিউশন’ বা ‘বর্ষা বিপ্লব’ নামে পরিচিতি পেয়েছে, তাতে আমাদের তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণ সাবেক স্বৈরাচারী শাসনের অবসান করেছে এবং আমরা আবারও নিজেদের মুক্ত করেছি।
জামায়াতের আমীর উল্লেখ করেন, বিগত সরকারের প্রায় ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে আমরা দেখেছি বিরোধী মতের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা দমন, ব্যাপক মাত্রায় অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পদ্ধতিগত ধ্বংসসাধন। স্বৈরাচার ও জুলুমের বিরোধিতার জন্য আমার দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য অনেককেই চরম মূল্য দিতে হয়েছে। গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার পক্ষে কথা বলায় আমাদের নেতৃবৃন্দকে হত্যা করা হয়েছে এবং আমাদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে, আমাদের সাহসী ছাত্র ও তরুণ সমাজের নেতৃত্বে স্বাধীনতার সংগ্রামে বাংলাদেশের মানুষ আবারও জেগে ওঠে এবং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় ‘আর নয়’।
তিনি বলেন, আমাদের অসংখ্য তরুণকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে আমাদের গণতান্ত্রিক আশা-আকাক্সক্ষাকে ধূলিসাৎ করতে বদ্ধপরিকর এক শাসকের হাতে। এই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ২৪ হাজারেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের নিয়মেই সবসময়ের মতোই, নিপীড়নের গাঢ় অন্ধকার ভেদ করে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আলোই জয়ী হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ আবারও বিজয়ী হয়েছে। আমরা আমাদের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত, কারণ তারা ন্যায়পরায়ণতার সাথে দেশ পরিচালনার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা এখন আবারও এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে আমাদের এই অঞ্চলে গণতন্ত্র, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার আলোকবর্তিকা হিসেবে দেশ পুনর্গঠনে এখনো বড় বড় সব চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
আজ আমি সেই চ্যালেঞ্জগুলোর কয়েকটি তুলে ধরতে চাই এবং একটি নবজাগ্রত বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার দলের ভিশন তুলে ধরতে চাই, যা হবে- একটি পুনর্জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ, একটি নবায়িত বাংলাদেশ এবং একটি নতুন বাংলাদেশ। আপনারা নিশ্চয়ই চারপাশে "অংঢ়রৎরহম ইধহমষধফবংয" বা "প্রত্যাশার বাংলাদেশ" শব্দগুলো দেখতে পাচ্ছেন।
আমরা চাই বাংলাদেশ এমন একটি আধুনিক বাজার অর্থনীতি (গড়ফবৎহ গধৎশবঃ ঊপড়হড়সরপ) হিসেবে গড়ে উঠুক, যা সামাজিক ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী এবং যেখানে কোনো নাগরিকই পিছিয়ে থাকবে না। আমরা এমন একটি দেশ চাই যা জাতীয় সার্বভৌমত্বকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেয় এবং একই সাথে একটি দায়িত্বশীল ও সক্রিয় আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক অংশীদার রাষ্ট্র হিসেবে ভূমিকা রাখে। আমরা এমন একটি জাতি হতে চাই, যা প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে তার অদম্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কেন্দ্রে রাখে এবং এমন একটি আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে বিশ্বাস করে যেখানে মূল্যবোধ ও নীতিবোধ আজও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠন করতে চাই, যা ছিল আমাদের দেশ প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি। আমার দল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, কেবল গণতন্ত্র এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমেই আমরা দেশ হিসেবে এগিয়ে যেতে পারি। কিন্তু আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন একটি জাতীয় ভিশন যা সুনির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করে জনগণের জীবনে কাক্সিক্ষত ও সত্যিকার পরিবর্তন আনবে এবং আমাদের বাংলাদেশকে নতুনভাবে রূপান্তরিত করে জনগণের জন্য সত্যিকারের সুফল বয়ে আনবে।
তিনি বলেন, বিগত প্রায় দুই দশকের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে আমরা অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পরিবর্তন দেখতে চাই। তাই এটি অত্যন্ত জরুরি যে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেন হয় দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন যা থেকে বাংলাদেশের মানুষ প্রায় ২০ বছর ধরে বঞ্চিত ছিল। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, আমাদের দল আসন্ন গণভোটে যুগপৎভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাবে এবং ভোট দেবে। আমাদের স্পষ্ট অবস্থান-সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’, জুলাই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’, এবং নতুন সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পক্ষে ‘হ্যাঁ’। তবে নির্বাচনই শেষ কথা নয়, কেবল শুরু মাত্র। এখন আমাদের যা প্রয়োজন তা হচ্ছে একটি নতুন জাতীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য যার মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের জন্য গণতান্ত্রিক অধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত হবে। দেশবাসীর কাছে আমাদের অঙ্গীকার হলো, আমরা এমন যেকোনো রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করব যারা তিনটি মৌলিক নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবেন: দুর্নীতি নির্মূল, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং এমন একটি শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর সংস্কার এগিয়ে নেওয়া- যা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ গর্ব করতে পারে এবং যা নিরলসভাবে জনগণের সেবায় কাজ করে যাবে। আমাদের কাছে শাসন মানে জনগণের সেবা করা। যদি আমরা সুযোগ পাই, আমরা জনগণের সেবক হিসেবে দেশ পরিচালনা করব এবং আমরা সর্বদা দায়িত্বের এই পবিত্র আমানতের মর্যাদা রক্ষা করবো। মূলধারার মুসলিম গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে, আমরা বিগত সময়ে জাতীয় বা স্থানীয়-প্রতিটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি এবং আমরা ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখব।
আমীরে জামায়াত আরও বলেন, নতুন বাংলাদেশ গঠন করতে নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা জানেন, নারীরা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং বাংলাদেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ নারী আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে যুক্ত যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম উচ্চ হার। আমরা এই হার আরও দ্রুত বাড়াতে চাই এবং এজন্য কন্যাশিশু ও তরুণীদের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। আমরা গর্বিত যে আমাদের দলের সদস্য সংখ্যার ৪৩ শতাংশ নারী। আমাদের দল সারাদেশে এমন সুযোগ সৃষ্টিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ- যাতে কোনো মেয়েই পিছিয়ে না থাকে এবং তারা নতুন বাংলাদেশে সমান নাগরিক হিসেবে তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশ করতে পারে। যারা সবার জন্য সমান সুযোগে বিশ্বাস করে, আমরা তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াব। আমরা বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ ও আধুনিক বাজার অর্থনীতি হিসেবে পুনর্গঠন করতে আমাদের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চাই।
তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট করেছি যে, বাংলাদেশে ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন নিজেদের স্বার্থে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ কুক্ষিগত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে যেকোনো প্রচেষ্টার পাশে আমরা দৃঢ়ভাবে থাকব। সমৃদ্ধি কেবল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বচ্ছতার মানদ-ের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক ও নতুন বাংলাদেশ কেবল তখনই সম্ভব, যখন ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জাতি নির্বিশেষে সকল নাগরিককে সমানভাবে দেখা হবে। আমার দল গর্বিত যে আমরা প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিক এবং তাদের অধিকারের রক্ষক হিসেবে পাশে আছি। সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করা কেবল আমাদের দায়িত্বই নয়, বরং এটি একটি বাধ্যবাধকতা এবং পবিত্র কর্তব্য, তা তারা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা অন্য যেকোনো ধর্মেরই হোক না কেন।
আমি অত্যন্ত গর্বিত যে আমাদের দলে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ৫ লাখেরও বেশি সদস্য রয়েছেন, যারা আমাদের দেশকে শক্তিশালী করতে ঐকবদ্ধভাবে একসাথে দাঁড়িয়েছেন। আর এভাবেই আমরা চাই নতুন বাংলাদেশ আমাদের অঞ্চলে এবং বিশ্বজুড়ে একটি শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত অংশীদার হয়ে উঠুক। পরিশেষে, আমি যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেই নতুন বাংলাদেশের আশার বার্তা দিয়েই আমি শেষ করব-
আপনারা আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি ও কর্মপরিকল্পনা থেকে দেখবেন আমাদের রাজনীতি বিভাজনের নয়, বরং আশা, প্রশান্তির নিরাময় এবং ঐক্যের। এই আশা একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশা, এমন একটি দেশের আশা যা অন্যদের পথ দেখাবে, এমন বাংলাদেশের আশা যেখানে সবাই সমান। আজ এবং প্রতিটি দিনের জন্য এটাই আমাদের দলের অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ দিতে সবাইকে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
আমি বিশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি সকল ইনটেলেকচুয়াল এবং রিসোর্স পারসনদের যারা এই সম্মেলনকে ফলপ্রসূ করতে যাচ্ছেন এবং আপনাদের সবাইকে আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি যারা আমাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছেন। আপনাদের অংশগ্রহণের জন্য আমরা আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আসুন আমরা স্থানীয়ভাবে, আঞ্চলিকভাবে এবং বৈশ্বিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এবং একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য ঐক্যবদ্ধ হই।