রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে মা শেখ রেহেনাকে প্লট বরাদ্দ নিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় দুই বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক। একইসঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গতকাল সোমবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এর বিচারক মো. রবিউল আলমের আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। এ রায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আদালতে প্রথমবারের মতো কোনো ব্রিটিশ এমপি দণ্ডিত হয়েছেন।
এদিকে এই খবর বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের প্রায় সবগুলো মিডিয়া।
টিউলিপ সিদ্দিক বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে ক্ষমতাসীন দল লেবার পার্টির সংসদ সদস্য। সমালোচনার মুখে চলতি বছরের শুরু দিকে দেশটির সিটি মিনিস্টার পদ ছাড়তে বাধ্য হন টিউলিপ। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতার কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তখন। এবার ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজধানীর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে শেখ রেহানাকে ১০ কাঠা সরকারি প্লট নিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলার রায় ঘোষণার পর টিউলিপকে নিয়ে আবারও সরব হয়েছে যুক্তরাজ্যের বেশিরভাগ মিডিয়া।
দেশটির প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান দুটি প্রতিবেদন করেছে টিউলিপকে নিয়ে। তাদের প্রথম প্রতিবেদনে শিরোনাম, Bangladesh court sentences UK MP Tulip Siddiq to two years prison in absentia (বাংলাদেশের আদালত যুক্তরাজ্যের এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে অনুপস্থিতিতে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন)। গার্ডিয়ান তার আরেকটিকে প্রতিবেদনে লিখেছে, What led to Bangladesh trial of former UK minister Tulip Siddiq in her absence? (যুক্তরাজ্যের সাবেক মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশে বিচারের পেছনে কারণ কী ছিল?)। স্কাই নিউজ লিখেছে, , Labour MP Tulip Siddiq sentenced to two years in prison at corruption trial in Bangladesh (লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে বাংলাদেশে দুর্নীতির মামলায় দুই বছরের কারাদণ্ড)।
দ্য টেলিগ্রাফ লিখেছে, Tulip Siddiq jailed for two years over corruption in Bangladesh (বাংলাদেশে দুর্নীতির অভিযোগে টিউলিপ সিদ্দিককে দুই বছরের কারাদণ্ড)। যুক্তরাজ্যের আরেক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট লিখেছে, Labour MP Tulip Siddiq handed two-year prison sentence for corruption in Bangladesh (লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে বাংলাদেশে দুর্নীতির অভিযোগে দুই বছরের কারাদণ্ড)। মাই লন্ডন লিখেছে, London MP Tulip Siddiq handed jail sentence in Bangladesh after trial in her absence (লন্ডনের এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে বাংলাদেশে অনুপস্থিতিতে বিচারের পর কারাদণ্ড)। এলবিসি লিখেছে, Labour MP Tulip Siddiq sentenced to two years in prison following corruption trial in Banglades (লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে বাংলাদেশে দুর্নীতির বিচারে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে)। মেট্রোর শিরোনাম করেছে, Labour MP Tulip Siddiq sentenced to jail over corruption in Bangladesh (লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে বাংলাদেশে দুর্নীতির অভিযোগে কারাদণ্ড)। আইটিভি শিরোনাম করেছে, Labour MP Tulip Siddiq given jail sentence in Bangladesh after corruption trial (লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে বাংলাদেশে দুর্নীতির বিচারের পর কারাদণ্ড)। দ্য সান লিখেছে, Labour MP & ex-minister Tulip Siddiq JAILED in absentia over corruption weeks after her aunt was sentenced to death (খালার মৃত্যুদণ্ডের কয়েক সপ্তাহ পর লেবার পার্টির এমপি ও সাবেক মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিককে দুর্নীতির অভিযোগে অনুপস্থিতিতে কারাদণ্ড)। এছাড়া, ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড পত্রিকা ডেইলি স্টার লিখেছে, Labour MP sentenced to two years in prison after major corruption scandal (লেবার পার্টির এমপিকে বড় দুর্নীতি কেলেঙ্কারির পর দুই বছরের কারাদণ্ড)।
লন্ডনে টিউলিপ সিদ্দিকের এমপি পদ কি থাকবে? বাংলাদেশের আদালতে ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা (এমপি) টিউলিপ সিদ্দিককে দুর্নীতির মামলায় দুই বছরের কারাদণ্ড ঘোষণার পর ওয়েস্টমিনিস্টারের রাজনীতি অঙ্গণে শুরু হয় তোলপাড়। হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেট আসন থেকে লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ এখন আইন অনুযায়ী তার পার্লামেন্টারি আসন ধরে রাখতে পারবেন কিনা, এটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অপরদিকে, দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং প্রভাবশালী মিত্র টিউলিপের কারাদণ্ড নিয়ে সরকারের অবস্থান লেবার পার্টিকে রাজনৈতিক ও নৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি করেছে।
ব্রিটিশ আইন কী বলে? যুক্তরাজ্যের ‘রিকল অব এমপি অ্যাক্ট ২০১৫’ অনুযায়ী, কোনও নির্বাচিত এমপি যদি একবছরের বেশি সময়ের জন্য কারাদণ্ড প্রাপ্ত হন, তবে তার পদ বাতিলের প্রক্রিয়া বা ‘রিকল পিটিশন’ শুরু হতে পারে। তাই টিউলিপের দণ্ড এই আইনের আওতায় পড়ে। তবে এখানে আরেকটি আইনি প্রশ্ন রয়েছে। আইনটি মূলত ব্রিটিশ আদালতের রায়ের ক্ষেত্রে সরাসরি কার্যকর হয়। বিদেশি আদালতের রায়, বিশেষ করে যে দেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কোনও বন্দিবিনিময় চুক্তি নেই, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একজন ব্রিটিশ এমপির পদ খারিজ করতে পারে কিনা— তা নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতপার্থক্য: ব্রিটেনে বাংলাদেশের রায়ের আইনি বৈধতা এবং টিউলিপ সিদ্দিকের ক্যারিয়ারের ওপর এর প্রভাব নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে দুই বিশিষ্ট আইনজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা হয়। লন্ড নের ল’ ম্যাট্রিক সলিসিটর্সের ব্যারিস্টার সালাহ উদ্দিন সুমন মনে করেন, ‘ঢাকার রায়ের ভিত্তিতে টিউলিপের পদ হারানোর কোনও আইনি সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘এটি ন্যায়বিচারের একটি বড় ব্যত্যয়। মিজ সিদ্দিককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তার অনুপস্থিতিতে ওই রায় দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী, প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার লঙ্ঘন করে দেওয়া কোনও বিদেশি আদালতের রায় যুক্তরাজ্যে কার্যকর বা গ্রহণযোগ্য নয়। এটি স্পষ্টতই একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রায়, যার ভিত্তিতে একজন ব্রিটিশ এমপিকে পদত্যাগে বাধ্য করা আইনত অসম্ভব।’ অপরদিকে, সিনিয়র লিগ্যাল কনসালটেন্ট লন্ডনের চ্যান্সেরী সলিসিটর্সের কর্ণধার ব্যারিস্টার মো. ইকবাল হোসেন বিষয়টিকে নৈতিকতার জায়গা থেকে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘আইনের মারপ্যাঁচ এক জিনিস আর একজন এমপির নৈতিক অবস্থান আরেক জিনিস। ঢাকার আদালত তথ্য-প্রমাণ যাচাই করেই রায় দিয়েছে যে, বাংলাদেশে সরকারি সম্পদ আত্মসাতে ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে। দুর্নীতি একটি বৈশ্বিক অপরাধ। কোনও ব্রিটিশ এমপি যদি বিদেশের আদালতেও আর্থিক কেলেঙ্কারিতে দোষী সাব্যস্ত হন, তবে সেটাকে ‘রাজনৈতিক মামলা’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। (ব্রিটিশ) জনগণের আস্থা ধরে রাখতে তার পদত্যাগের প্রচণ্ড চাপ তৈরি হবে। কারণ, দুর্নীতির দায়ে দণ্ড জনপ্রতিনিধিত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’’
স্টারমারের রাজনৈতিক ‘মাথাব্যথা’ : আইনি লড়াইয়ের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক চাপ। টিউলিপ সিদ্দিক কেবল একজন এমপি নন, তিনি প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং পাশের আসনের প্রতিনিধি। স্টারমারের নির্বাচনি এলাকা হলবর্ন অ্যান্ড সেন্ট প্যানক্রাস এবং টিউলিপের আসন পাশাপাশি। বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি ইতোমধ্যেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে, দুর্নীতির দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত এক এমপিকে স্টারমার সমর্থন দেবেন কিনা। স্টারমার যদি টিউলিপকে রক্ষা করেন, তবে তার প্রতিশ্রুত ‘সততার রাজনীতি’ প্রশ্নবিদ্ধ করার লোকের অভাব হবে না। আর যদি ব্যবস্থা নেন, তবে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া রায়কে পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দেবেন, যে রায় টিউলিপের আইনজীবীরা ‘প্রহসন’ বলে খারিজ করে আসছেন। টিউলিপ সিদ্দিক শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন। তিনি পুরো প্রক্রিয়াকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর আগে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে তার আর্থিক সম্পর্কের তদন্ত শুরু হলে তিনি ট্রেজারির ইকোনমিক সেক্রেটারির পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন, তবে এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ভবিষ্যৎ কী : টিউলিপ সিদ্দিকের রাজনৈতিক ভাগ্য এখন অনেকটাই নির্ভর করছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘কমিটি অন স্ট্যান্ডার্ডস’-এর ওপর। তারা যদি মনে করে, এই দণ্ডাদেশ এমপিদের আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে, তবে বিদেশি রায় হওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
প্রতিক্রিয়ায় যা বললেন টিউলিপ: রায় ঘোষণা হওয়ার পর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় টিউলিপ সিদ্দিক তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়কে ‘ত্রুটিপূর্ণ ও প্রহসনমূলক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘এর (বিচারের) শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ত্রুটিপূর্ণ ও প্রহসনমূলক ছাড়া আর কিছুই নয়। যুক্তরাজ্যের হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেটের এই এমপি আরও বলেন, এই ক্যাঙ্গারু কোর্টের সম্পূর্ণ অযৌক্তিক রায়টি আগে থেকেই অনুমান করা যাচ্ছিল...আমার মনোযোগ সবসময় হ্যাম্পস্টেড এবং হাইগেটের আমার ভোটারদের ওপর এবং আমি বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতিতে বিভ্রান্ত হতে রাজি নই। এদিকে টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে দেওয়া দুর্নীতির রায়কে স্বীকৃতি দিচ্ছে না তার দল লেবার পার্টিও। কারণ হিসেবে দলটি বলছে, বিচারকাজ চলাকালে টিউলিপ সিদ্দিককে ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এর আগে, গত সপ্তাহে শীর্ষস্থানীয় ব্রিটিশ আইনজীবীদের একটি দল বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, টিউরিপে সিদ্দিকের অনুপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে চলা বিচারকাজটি ‘সাজানো, কল্পিত এবং অন্যায্য’।