আজ বৃহস্পতিবার। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি তথা জাতীয় উন্মেষের মাস ফেব্রুয়ারির ৫ম দিন। সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর এ জাতি নিজের করে পেয়েছে মাতৃভাষা বাংলাকে। বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকারটুকু প্রতিষ্ঠা করে গেছেন; যা ইতিহাসের পাতায় হয়ে আছে স্ব-মহিমায় ভাস্বর।
‘পলাশী প্রান্তর থেকে বাংলাদেশ ১৭৫৭, ১৯৭১ ও আমাদের স্বাধীনতা’ শীর্ষক গ্রন্থে খুরশীদ আলম সাগর লিখেছেন, একটি জাতির চিরন্তন সম্পদ হলো তার ভাষা, ভাব প্রকাশের সর্বোত্তম বাহন। পাকিস্তান নামক শিশু রাষ্ট্রটি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্ব থেকেই এর রাষ্ট্রীয় ভাষা কি হবে তা নিয়ে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। সম্প্রসারণবাদী শোষক ব্রিটিশকে তাড়িয়ে পূর্ব বাংলা, সিন্ধু, খ-িত পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে সৃষ্টি হয় পাকিস্তান।
‘পূর্ব বাংলা’ পূর্ব পাকিস্তান নামে এবং সিন্ধু, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে পরিচিতি লাভ করে পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্র। সিন্ধি, বেলুচ, পাঞ্জাবি, পোশতু ইত্যাদি ভাষাভাষী মানুষ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। অন্যদিকে বাংলা, চাকমা ইত্যাদি ভাষাভাষী মানুষ বাস করে পূর্ব পাকিস্তানে। চাকমা বা অন্য ছোট ছোট জাতিসত্তার ভাষাভাষী লোক অত্যন্ত সীমিত। অন্যদিকে পুরো পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। তাই সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করার জন্য। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্থপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ থেকে শুরু করে প্রায় সব নেতাই একমাত্র উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার কথা জোর দিয়ে বলতে থাকেন।
ভাষা সৈনিক, ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক এম আর মাহবুব তার ‘বাঙালা কী করে রাষ্ট্রভাষা হলো’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন, অধ্যাপক (পরবর্তীতে প্রিন্সিপাল) আবুল কাসেম বহু চেষ্টা করেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসকমন্ডলীকে এ ব্যাপারে কোনোরূপ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করাতে সক্ষম হননি। ফলে সর্বস্তরে বাংলা চালু ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ব্যবহার একটি বাকসর্বস্ব বক্তব্যে পরিণত হয়। এমনকি যুক্তফ্রন্টের ১৯৫৪ সালের নির্বাচনোত্তর ক্ষমতাসীন হলেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
অধ্যাপক আবুল কাসেম পরবর্তীতে পরিকল্পিতভাবে সর্বস্তরে বাংলা চালুর জন্য বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ১৯৬২ সালে (রাজধানীর মিরপুরে) বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সর্বস্তরে বাংলা চালু ও ভাষা-আন্দোলনের চেতনা ও বহুমুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।