পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম নেতা আছেন যারা একইসাথে তাত্ত্বিক জ্ঞান, আধ্যাত্মিক গভীরতা এবং সামরিক রণকৌশলের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটাতে পেরেছেন। আধুনিক বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আপসহীন প্রতিরোধের যে মিনারটি গত চার দশক ধরে সগৌরবে দাঁড়িয়ে ছিল, তার নাম আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনী। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬, শনিবার সকালে মার্কিন ও জায়নবাদী ইসরাইলী জোটের এক কাপুরুষোচিত বিমান হামলায় তিনি শাহাদাত বরণ করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার এই মহাপ্রয়াণ কেবল ইরানের জন্য নয়, বরং গোটা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

এক তপোবনের শুরু

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী ১৯৩৯ সালের ১৯শে এপ্রিল ইরানের পবিত্র মাশহাদ শহরে এক অতি সাধারণ কিন্তু পরম ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আয়াতুল্লাহ আল-হাজ সৈয়দ জাওয়াদ খামেনী ছিলেন মাশহাদের একজন প্রখ্যাত আলেম এবং উচ্চপর্যায়ের মুজতাহিদ। তাঁদের পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন আজারবাইজান থেকে। খামেনীর শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্য ও আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। তিনি নিজেই এক স্মৃতিকথায় বলেছিলেন, "আমার বাবা ছিলেন অত্যন্ত স্বল্পভাষী এবং একনিষ্ঠ আলেম। আমাদের জীবন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা, মাঝে মাঝে ঘরে পর্যাপ্ত খাবারও থাকত না।" কিন্তু তাঁর মাতা খাদিজাহ মিরদামাদি ছিলেন একজন বিদুষী নারী, যিনি শৈশবে খামেনীর হৃদয়ে কুরআন ও সাহিত্যের বীজ বুনে দিয়েছিলেন।

শিক্ষা

মাত্র চার বছর বয়সে আলী খামেনীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় পবিত্র কুরআন মাজিদ শিক্ষার মাধ্যমে। মাশহাদের একটি প্রাথমিক স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে তিনি সরাসরি ধর্মীয় শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। তিনি মাশহাদ ও নাজাফের প্রখ্যাত আলেমদের কাছে ফিকহ ও উসুল শিক্ষা করেন। তবে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ মোড়টি আসে ১৯৫৮ সালে যখন তিনি পবিত্র কোম (Qom) শহরে যান। সেখানে তিনি ইসলামী বিপ্লবের মহানায়ক আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনীর সান্নিধ্য লাভ করেন। খোমেনীর বিপ্লবী চেতনা এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান তরুণ খামেনীকে গভীরভাবে আন্দোলিত করেছিল।

পাহলভি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও জেল-জুলুম

ষাটের দশকে যখন রেজা শাহ পাহলভির স্বৈরাচারী শাসন ইরানী জনগণের ওপর স্টিমরোলার চালাচ্ছিল, তখন আলী খামেনী রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবে আবির্ভূত হন। ইমাম খোমেনীর বার্তা দেশময় ছড়িয়ে দেওয়ার অপরাধে শাহের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘সাভাক’ তাঁকে অন্তত ছয়বার গ্রেফতার করে। দিনের পর দিন অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে নিষ্ঠুর নির্যাতন সহ্য করেছেন তিনি। একবার তাঁকে দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের দুর্গম এলাকা ইরানশাহরে নির্বাসিত করা হয়। কিন্তু কোনো জেল-জুলুমই তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পারেনি। তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতা মাশহাদ ও কোমের তরুণদের বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল।

১৯৭৯: বিজয়ের সূর্য ও নতুন দায়িত্ব

১৯৭৯ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে যখন ইসলামী বিপ্লব চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে, তখন আলী খামেনী বিপ্লবের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে তিনি প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী, রেভল্যুশনারি গার্ডসের (IRGC) সুপারভাইজার এবং তেহরানের জুম্মার খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে একটি মসজিদে বক্তৃতা দেওয়ার সময় এক ঘাতকের পেতে রাখা বোমায় তিনি ডান হাত হারান। কিন্তু দমে যাননি এই বীর। একই বছর তিনি ইরানের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং টানা দুই মেয়াদে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন।

যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব: ইরাক-ইরান যুদ্ধ

প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল ১৯৮০-৮৮ সালের ইরাক-ইরান যুদ্ধ। সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী যখন পশ্চিমা শক্তির মদদে ইরানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন প্রেসিডেন্ট খামেনী নিজে সামরিক ইউনিফর্ম পরে ফ্রন্টলাইনে চলে যেতেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বিমুখী নীতি খামেনীর মনে এক গভীর দাগ কেটেছিল। এই যুদ্ধই তাঁকে শিখিয়েছিল যে, টিকে থাকতে হলে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

সুপ্রিম লিডার হিসেবে অভিষেক (১৯৮৯-২০২৬)

১৯৮৯ সালের ৩রা জুন ইমাম খোমেনী ইন্তিকাল করলে সারা ইরান যখন শোকে মুহ্যমান, তখন অভিভাবক পরিষদের (Assembly of Experts) সিদ্ধান্তে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বা ‘সুপ্রিম লিডার’ হিসেবে মনোনীত করা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি বিনম্রতার সাথে বলেছিলেন, "আমি নিজেকে এই পদের যোগ্য মনে করি না।" কিন্তু গত ৩৭ বছরে তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি কেবল যোগ্য নন বরং আধুনিক যুগের অন্যতম সেরা রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক কৌশলী।

‘প্রতিরোধের অক্ষ’ Axis of Resistance) নির্মাণ

সুপ্রিম লিডার হিসেবে খামেনীর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদ এবং জায়নবাদ বিরোধী একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করা। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের নিয়ে তিনি যে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ গড়ে তুলেছিলেন, তা আজ বিশ্বের মানচিত্রে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। শহীদ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি ছিলেন তাঁর এই কৌশলের প্রধান কারিগর। ইসরায়েল ও আমেরিকার সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে তিনি ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম মুক্তির আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন।

প্রতিরোধী অর্থনীতি ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন

পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের ওপর ইতিহাসের কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। খামেনী এর জবাবে ‘ইকতেসাদে মুকাভামাতি’ বা ‘প্রতিরোধী অর্থনীতি’র ডাক দেন। তিনি ইরানকে ন্যানোটেকনোলজি, মহাকাশ গবেষণা এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তিতে বিশ্বে শীর্ষ দশে নিয়ে আসেন। তাঁর অধীনেই ইরান ড্রোন ও মিসাইল প্রযুক্তিতে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করে, যার প্রমাণ আমরা সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে দেখেছি।

২০২৫-২৬: চূড়ান্ত লড়াই ও শাহাদাত

বিগত বছরগুলোতে ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরাইলী চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালালে খামেনী সরাসরি পাল্টা জবাবের নির্দেশ দেন। তিনি বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, "কোনো হামলাকারীকেই রেহাই দেওয়া হবে না।" ২৬শে ফেব্রুয়ারী ২০২৬-এ ট্রাম্প প্রশাসন যখন ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে ইরানে হামলা শুরু করে, তখন খামেনী তাঁর শেষ বক্তব্যেও জাতিকে আত্মসমর্পণের পরিবর্তে সাহসিকতার সাথে লড়াইয়ের আহ্বান জানান।

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে তেহরানে তাঁর নিজ কম্পাউন্ডে যখন মার্কিন-ইসরাইলী বিমান হামলা হয়, তখন তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যসহ মহান আল্লাহর দরবারে পাড়ি জমান। তাঁর শাহাদাত বরণের খবরে সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

আগামীর পথচলা

আয়াতুল্লাহ খামেনীর জীবন থেকে আমাদের শেখার আছে অনেক কিছু। তিনি শিখিয়ে গেছেন:

আপসহীনতা: সত্যের পথে থাকলে পৃথিবীর কোনো পরাশক্তিকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই।

স্বাবলম্বিতা: বিদেশী সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব মেধা ও শ্রম দিয়ে দেশ গড়তে হবে।

উম্মাহর ঐক্য: শিয়া-সুন্নি ভেদাভেদ ভুলে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের দাবি।

বিপ্লবীরা কখনো মরে না

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ ও বিপ্লবের চেতনা বেঁচে থাকবে অনন্তকাল। তিনি এমন এক প্রজন্ম তৈরি করে গেছেন যারা তাঁর অভাব পূরণ করবে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ধারণা ছিল তাঁকে হত্যা করে ইরানকে নতজানু করা যাবে, কিন্তু তারা জানে নাÑএক খামেনীর রক্ত থেকে হাজারো খামেনী জন্ম নেবে।