ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে ৩০০ আসনে ৭২৩জনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। যাচাই বাছাইয়ে ১৮৪২ জনের প্রার্থীতা বৈধ বলে ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং অফিসারগণ। সারাদেশে ৩০০ আসনে ২৫৬৮টি মনোনয়ন পত্র দাখিল করা হয়েছে। বাতিলকৃত প্রার্থীরা আগামী ৯ জানুয়ারীর মধ্যে আপিল করতে পারবেন। এদিকে কোন কোন এলাকায় প্রার্থীতা বাছাইয়ে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রার্থীরা। কোন মহলের ইন্ধনে তুচ্ছ কারণে প্রার্থিতা বাতিল করারও অভিযোগ রয়েছে। সকল দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করার আহবান জানিয়েছেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। অন্যথায় সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ দেখা দেবে বলে প্রশ্ন উঠেছে।

ইসি জানায়, এবারের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র গ্রহণের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪০৬টি, যার বিপরীতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থী। যাচাই-বাছাই শেষে ৩০০ আসনে ৭২৩জনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। আর ১৮৪২ জনের প্রার্থীতা বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আর ইন্তিকাল করায় খালেদা জিয়ার তিনটি আসনে প্রার্থিতা সমাপ্ত করা হয়েছে।

যাচাই-বাছাই শেষে অঞ্চল বা বিভাগ অনুযায়ী বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা হচ্ছেÑ ঢাকা অঞ্চলে ৩০৯ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে, যেখানে বাতিল হয়েছে ১৩৩টি।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ১৩৮ জন এবং বাতিল হয়েছে ৫৬টি মনোনয়নপত্র। রাজশাহী অঞ্চলে ১৮৫ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, আর বাতিল হয়েছে ৭৪ জন প্রার্থীর মনোনয়ন।

এছাড়া খুলনা অঞ্চলে ১৯৬ জন প্রার্থী বৈধতা পেয়েছেন। আর অবৈধ হয়েছেন ৭৯ জন প্রার্থী। বরিশাল অঞ্চলে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ১৩১ জন আর বাতিল হয়েছে ৩১ জন প্রার্থীর।

সিলেট অঞ্চলে ১১০ জন প্রার্থীর আবেদন বৈধ হয়েছে, বাতিল হয়েছে ৩৬ জনের। ময়মনসিংহ অঞ্চলে ১৯৯ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ পাওয়া গেছে, বাতিল হয়েছে ১১২ জনের।

কুমিল্লা অঞ্চলে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ২৫৯ জন, বাতিল হয়েছে ৯৭ জনের। রংপুর অঞ্চলে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ২১৯ জন ও বাতিল হয়েছে ৫৯ জনের এবং ফরিদপুর অঞ্চলে ৯৬ জন প্রার্থী বৈধতা পেয়েছেন, বাতিল হয়েছে ৪৬ জন প্রার্থীর মনোনয়ন।

নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় মোট ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুজনিত কারণে দিনাজপুর-৩, বগুড়া-৭ এবং ফেনী-১ আসনের ৩টি মনোনয়নপত্র কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই কার্যক্রম সমাপ্ত করা হয়েছে। প্রকাশিত এই ফলাফলের ওপর কোনো প্রার্থীর আপত্তি থাকলে তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন। আপিল শুনানি শেষে চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে জানিয়েছে ইসি।

মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন, হাইকোর্টে থাকা একটি মামলার তথ্যগত গরমিল থাকায় কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে জামায়াতের প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। মনোনয়ন ফরমে তথ্য অসংগতির কারণে বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, ভোটার তালিকার স্বাক্ষর এবং তথ্যে গরমিল থাকায় ঢাকা-৯ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী এবং চিকিৎসক তাসনিম জারা, মনোনয়নপত্রের স্বাক্ষরের সাথে নির্বাচন কমিশনে থাকা দলীয় স্বাক্ষরের মিল না থাকায় চট্টগ্রাম-৫ আসনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। তারা আগামী ৯ জানুয়ারীর মধ্যে নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন।

মনোনয়ন বাতিলের কারণ সর্ম্পকে রির্টানিং কর্মকর্তারা বলেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থক তালিকায় অনিয়ম, ঋণখেলাপি সংক্রান্ত সমস্যা, হলফনামায় স্বাক্ষরের অভাব, অসম্পূর্ণ বা ভুল কাগজপত্র, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতা এবং অনুমোদিত দলীয় প্রতিনিধির স্বাক্ষর না থাকায় মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, কোনো কোনো জেলায় তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। প্রদত্ত তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। কোনো এক মহলের ইন্ধনে এসব করা হচ্ছে বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। যদি এমন চলতে থাকে, তাহলে আগামী নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হবে কি না, তা সন্দেহজনক। যেসব প্রার্থীর প্রার্থিতা অযথা বাতিল হয়েছে, তাদের অবিলম্বে বৈধ ঘোষণা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য তিনি নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান।

সংশোধিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। ২১ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি এবং চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।