ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ চলছে গত ১৫ দিনধরে। যুদ্ধ বাড়তে থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই অবস্থায় ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্ক কোন দিকে ওয়াশিংটন নাকি তেহরান এই প্রশ্ন এখন কূটনৈতিক ও ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্ক ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষেই ভারসাম্যপূর্ণ ও কৌশলগত হওয়া উচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক অত্যন্ত জোরদার এবং কৌশলগত। অন্যদিকে তেহরানের সাথে সম্পর্ক সাধারণত সংঘাতমুক্ত মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্ক। তবে ইরানের ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ঢাকার অর্থনীতিতে, জ¦ালানি ও মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। যার ফলে ঢাকার সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্যের দাবি রাখে। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ হওয়া জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ (প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল) হরমুজ প্রণালী দিয়ে পাড়ি সরবরাহ লাইনে আসে। বাংলাদেশ মূলত কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি করে, যাদের রপ্তানিও হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। এদিকে বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, ইরান যুদ্ধের কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত মোট ৪৭৫টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় ইরানসহ মুসলিমপ্রধান উন্নত দেশের ডি-৮ জোটের শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। গত শুক্রবার সম্মেলনের আয়োজক ইন্দোনেশিয়া এ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। চার দিনের এ সম্মেলন ১২ এপ্রিল শুরু হয়ে ১৫ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা ছিল। সম্মেলন স্থগিত করা হলেও নতুন কোনো তারিখ এখনো জানানো হয়নি। ইরান ও ইন্দোনেশিয়া ছাড়া ডি-৮ অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থার বাকি সদস্যরা হলো; আজারবাইজান, বাংলাদেশ, মিশর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্ক। অপরদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরান যুদ্ধ নিয়ে নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার প্রচারিত ওই সাক্ষাৎকারে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ কখন শেষ হতে পারে-এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, ‘যখন আমি এটি অনুভব করব, ঠিক আছে, তখন।’
চলতি মাসের শুরুতে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধপরিস্থিতি নিয়ে অবস্থান ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ। রোববার (১ মার্চ) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও মানুষের কল্যাণের জন্য সবপক্ষকে সহিংসতার পথ ছেড়ে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে ইরানের ওপর হামলার ঘটনায় সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বিবৃতিতে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়েছে। ওই অঞ্চলে দ্রুত শান্ত পরিবেশ ফিরে আসবে এবং সমগ্র অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে। বিবৃতির কোথাও ইরানে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হামলা চালাচ্ছে, তা উল্লেখ নেই। উল্টো ‘প্রতিরোধ’ হিসেবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে যে হামলা করেছে, তাকে ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের’ বলে নিন্দা করেছে বাংলাদেশ সরকার। আর এ নিয়েই সামাজিক মাধ্যমে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী একে ‘বাংলাদেশ মার্কিন হামলায় উদ্বেগ, আর ইরানের প্রতিরোধের নিন্দা জানিয়েছে!’ উল্লেখ করে পোস্ট দিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইস্যু করা দুটি বিবৃতির ব্যাখ্যায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অবস্থান খুব সোজা, প্রথম কথা হচ্ছে আমরা আমাদের জনগণ মানে আমাদের যারা নাগরিক ওই অঞ্চলে আছেন, তাদের স্বার্থ রক্ষা। আর আমরা মনে করি না, যুদ্ধ বা সংঘাত কোনো সমাধান আনতে পারে। আমরা চাই দ্রুততম সময়ে আলোচনা বা কূটনীতির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে এই সমস্যার সমাধান হোক।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক সাবু বলেন, ‘খুবই হতাশা ও ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, যুক্তরাষ্ট্র ও অবৈধ দখলদার ইসরাইল রাষ্ট্রের যৌথভাবে ইরানের ওপর আক্রমণ, ইরানি সুপ্রিম নেতাকে হত্যা এবং তার জবাবে ইরানের পাল্টা হামলা চালায়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার বিবৃতিতে ইরানের ওপর হামলার ঘটনায় সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। এরপরই শান্তি, স্থিতিশীলতা ও মানুষের কল্যাণের জন্য সবাইকে সহিংসতার পথ ছেড়ে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ইরান যুদ্ধ যদি মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়, তার প্রভাব শুধু সামরিক থাকবে না; জ্বালানিবাজার, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং বৃহৎ শক্তির কৌশলগত পুনর্বিন্যাসে তা প্রতিফলিত হবে। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর বৃহত্তর প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ এমন এক ভৌগোলিক অবস্থানে আছে, যেখানে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা ও মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা একসঙ্গে প্রভাব ফেলছে। ফলে আমাদের নিরাপত্তা এখন বন্দর ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ, ট্রেড রুট, সীমান্ত স্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা সংকট, সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন।
যুদ্ধে অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি: কূটনৈতিক ও ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক থাকায় ইরান-ইসরাইল সংঘাত ঘিরে দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা, রপ্তানি বাণিজ্য এবং প্রবাসী আয় নিয়ে সংকট তৈরি হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরাইল ও ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন এক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে দেশের মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ কমে যাওয়া, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকিও দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক, ফেব্রুয়ারি ২০২৬’ প্রতিবেদনে অর্থনীতির কিছু সূচকে সামান্য স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিললেও রাজস্ব আয়, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন ব্যয়ের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব যুক্ত হলে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন। তিনি বলেন, ‘নতুন সংকট হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট। লম্বা সময় ধরে যুদ্ধ চলতে থাকলে সংকটগুলো দেখা দেবে। ফলে মাইক্রো অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়তে পারে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’ মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপের শঙ্কা : বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সুব্রত কুমার সাহা বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইরান-ইসরাইল সংঘাতে বিশেষ করে বিশ্বের প্রধান জ্বালানি রপ্তানির পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ার আশংকা রয়েছে, যার মারাত্মক প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়বে। সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের তেলের মজুদ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বর্তমানে আমরা কেবল ৪৫ দিনের জ্বালানি সংরক্ষণ করতে পারি। যদি তিন থেকে চার মাসের জ্বালানি সংরক্ষণের সক্ষমতা গড়ে তোলা যায়, তা হলে কাজে আসবে।
এই সংঘাত এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন বিশ্ব বাণিজ্য ইতিমধ্যেই সুরক্ষাবাদী নীতির কারণে চাপের মধ্যে রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে এবং বাণিজ্য ব্যয় বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ ও বাণিজ্য সুরক্ষাবাদ একত্রে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে থামিয়ে দিতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি বিভাগের একজন পরিচালক বলেন, “মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে।” ইরানে অবস্থানরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই বিষয়ে আপডেট নেই। আমাদের অবস্থান মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে।”
যা আছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে: হামলার প্রেক্ষাপটে ইরানে বসবাসরত বাংলাদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে সরকার গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, শত্রুতা অব্যাহত থাকলে, তা আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও বেসামরিক নাগরিকের কল্যাণকে আরও বিপন্ন করবে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে সরকার মতপার্থক্য নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতির পথে ফিরে আসার প্রয়োজনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। বিবৃতিতে অঞ্চলটির কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানানো হয়। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে– বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। দ্রুত পরিস্থিতি শান্ত হবে এবং অঞ্চলজুড়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা শিগগিরই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে বলে বাংলাদেশ আশা প্রকাশ করছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার প্রতিবাদে ঢাকায় বিক্ষোভ: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার প্রতিবাদে রাজধানীতে মানববন্ধন, সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত মঙ্গলবার (৩ মার্চ) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এ মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।