প্রথম দিনে ৭০টি আপিল শুনানি

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির প্রথম দিনে ৭০ জনের শুনানি শেষে ৫২টি আপিল মঞ্জুর করেছেন। তার মধ্যে ৫১ জনের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেছে, বাতিলের একটি আবেদন মঞ্জুর করে প্রার্থিতা বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হামিদুর রহমান আযাদ ও ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারার মনোনয়নও বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এর বিরুদ্ধে আপিল হয়েছিল ইসিতে। সেই আপিল মঞ্জুর হওয়ায় টিকলেন না একরামুজ্জমান। আপিল শুনানি শেষে ১৫জনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে এবং ৩ জনের মনোনয়ন স্থগিত রাখা হয়েছে।

গতকাল শনিবার আপিল শুনানি শেষে এসব সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। শুনানিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ও চার নির্বাচন কমিশনার এসব আপিল আবেদন শুনে নিষ্পত্তি করছেন। এসময় ইসি সচিব আখতার আহমেদ ও আইন শাখার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ইসি সচিব জানান, নির্বাচন কমিশন আপিল শুনানির প্রথম দিনে ৭০ জন প্রার্থীর শুনানি হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি আপিল নামঞ্জুর, ৫২টি মঞ্জুর এবং তিনটি পেন্ডিং রয়েছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে স্বতন্ত্র ও দলীয় প্রার্থী হতে আড়াই হাজারেরও বেশি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করে ৭২৩ জনের প্রার্থিতা বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। তাতে এখন পর্যন্ত বৈধ প্রার্থী রয়েছেন এক হাজার ৮৪২ জন।

তফসিল অনুযায়ী, আপিল নিষ্পত্তি শেষে ‎ প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সংখ্যা তখনই চূড়ান্ত হবে। প্রতীক বরাদ্দ হবে ২১ জানুয়ারি এবং প্রচার শুরু হবে ২২ জানুয়ারি থেকে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ভোটগ্রহণ।

শুনানির সূচি: এবার মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে মোট ৬৪৫টি আপিল আবেদন জমা পড়ে। শনিবার শুরু হওয়া এ শুনানি চলবে আগামী ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।

১০ জানুয়ারি: আপিল নম্বর ১-৭০ (সম্পন্ন), ১১ জানুয়ারি: আপিল নম্বর ৭১-১৪০, ১২ জানুয়ারি: আপিল নম্বর ১৪১-২১০, ১৩ জানুয়ারি: আপিল নম্বর ২১১-২৮০, ১৪ জানুয়ারি: আপিল নম্বর ২৮১-৩৫০, ১৫ জানুয়ারি: আপিল নম্বর ৩৫১-৪২০, ১৬ জানুয়ারি: আপিল নম্বর ৪২১-৪৯০, ১৭ জানুয়ারি: আপিল নম্বর ৪৯১-৫৬০, ১৮ জানুয়ারি: আপিল নম্বর ৫৬১ থেকে অবশিষ্ট সব।

‎রায়ের অনুলিপি ও ফলাফল: ‎ইসি জানিয়েছে, শুনানি শেষে ফলাফল মনিটরে প্রদর্শন করা হবে এবং সংশ্লিষ্টদের ই-মেইলে পিডিএফ কপি পাঠানো হবে। এছাড়া নির্বাচন ভবনের অভ্যর্থনা ডেস্ক থেকেও অনুলিপি সংগ্রহ করা যাবে। ১০-১২ জানুয়ারির আপিল শুনানীর রায়: ১২ জানুয়ারি, ১৩-১৫ জানুয়ারির রায়: ১৫ জানুয়ারি, ১৬-১৮ জানুয়ারির রায়: ১৮ জানুয়ারি বিতরণ করা হবে।

আপিলে প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা হওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের বিচক্ষণ, ন্যায়সঙ্গত ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কক্সবাজার-২ (মহেশখালীকুতুবদিয়া) আসনে আমার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ জন্য আমি সর্বপ্রথম মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে আন্তরিক শুকরিয়া আদায় করছি। এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি দক্ষ, সাহসী ও পেশাদার লিগ্যাল টিম অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে কাজ করেছে। তাদের পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও পেশাগত সততার জন্য আমি তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।

তিনি বলেন, মনোনয়ন বাতিলের এই সিদ্ধান্তে দেশবাসী, বিশেষ করে কক্সবাজার-২ (মহেশখালী–-কুতুবদিয়া) এলাকার জনগণ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ ছিলেন। সেই কঠিন সময়ে আপনারা আমার জন্য দোয়া করেছেন, পাশে থেকেছেন এবং নৈতিক শক্তি জুগিয়েছেন। আপনাদের এই অভূতপূর্ব ভালোবাসা, সমর্থন ও দোয়ার জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। বিশেষভাবে মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আপনাদের আস্থা, সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান আমাকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। ইনশাআল্লাহ, জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র ও ন্যায়ের প্রশ্নে আগামীতেও আমি দায়িত্বশীল ও দৃঢ় ভূমিকা পালন করে যেতে সচেষ্ট থাকব।

যাদের আপিল মঞ্জুর করেছে ইসি

গাজীপুর-৫: জাতীয় পার্টির সফিউদ্দিন সরকারের হলফনামা বৈধ ঘোষণা করে মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। যাদের মনোনয়ন পত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, তারা হলেন, কক্সবাজার-২ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হামিদুর রহমান আযাদ, ফেনী-১: বাংলাদেশ কংগ্রেসের ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরী, কিশোরগঞ্জ-৪: স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহীন রেজা চৌধুরী, নড়াইল-১: স্বতন্ত্র প্রার্থী উজ্জল মোল্লা, কিশোরগঞ্জ-৫: স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মুজিবর রহমান ইকবাল, কিশোরগঞ্জ-১: খেলাফত মজলিস প্রার্থী মাওলানা আহমদ আলী, চাঁদপুর-১: জাতীয় পার্টির হাবীব খান, নেত্রকোণা-৪: বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির চম্পা রাণী, ময়মনসিংহ-৭: বিএনপির মাহবুবুর রহমান, পঞ্চগড়-১: জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির আল রাশেদ প্রধান, পঞ্চগড়-২: জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি আল রাশেদ প্রধান, নরসিংদী-৫: বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মশিউর রহমান, মাগুরা-২: জাতীয় পার্টির মশিয়ার রহমান, কিশোরগঞ্জ-৪: স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী রেহা কবির, হবিগঞ্জ-৪: এবি পার্টির মোকাম্মেল হোসেন, গাইবান্ধা-১: স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তফা মহসিন, হবিগঞ্জ-১: জাসদের কাজী তোফায়েল আহম্মেদ, বগুড়া-৬: বাসদের দিলরুবা, নরসিংদী-২: ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মোহাম্মদ ইব্রাহীম, নড়াইল-২: জাতীয় পার্টির প্রার্থী খন্দকার খালেকুজ্জামান, দিনাজপুর-৬: স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহনেওয়াজ ফিরোজ, খুলনা-৫: জাতীয় পার্টির শামীম আরা পারভীন, ঢাকা-১৮: বাসদের সৈয়দ হারুন অর রশীদ, কুড়িগ্রাম-২: জাতীয় পার্টির পনির উদ্দিন আহমদ, গোপালগঞ্জ-২: স্বতন্ত্র কামরুজ্জামান ভূঁইয়া, ঝালকাঠি-১: জাতীয় পার্টির কামরুজ্জামান খান, রংপুর-৪: স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ আলম বাসার, শরীয়তপুর-১: স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম মোস্তফা, শরীয়তপুর-৩: জাতীয় পার্টির আবদুল হান্নান, নরসিংদী-১ জাতীয় পার্টি মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল, নারায়ণগঞ্জ-৪: জাতীয় পার্টির ছালাউদ্দিন খোকা, শরীয়তপুর-১: স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, গাজীপুর-৩: ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি শামীম আহমেদ, টাঙ্গাইল-১: স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আলী, শরীয়তপুর-১: বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি নূর মোহাম্মদ মিয়া, ফরিদপুর-৪: বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মিজানুর রহমান, গাজীপুর-২: স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাউদ্দিন সরকার, গাজীপুর-৫: বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রহুল আমিন, চট্টগ্রাম-১১: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নূর উদ্দিন, চাঁপাইনবয়াবগঞ্জ-২: জাতীয় পার্টির খুরশীদ আলম, রাজশাহী-৫: বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি আলতাফ হোসেন মোল্লা, কুমিল্লা-১: বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বড়ুয়া মনোজিত ধীমন, লালমনিরহাট-১: স্বতন্ত্র রেদওয়ানুল হক, ঢাকা-১৮: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আনোয়ার হোসেন, ঢাকা-৯: স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা, চাঁদপুর-২: ইসলামী আন্দোলনের মানসুর আহমদ সাকী, মাদারীপুর-২: স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল ইসলাম সাঈদ আনসারী, বগুড়া-৩: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শাহজাহান তালুকদার, কুমিল্লা-৯: খেলাফত মজলিসের আবদুল হক আমিনী, গাজীপুর-১: জাতীয় পার্টি শফিকুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-১: বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রার্থী মাওলানা আহমদ আলীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

যাদের আপিল না-মঞ্জুর

বাগেরহাট-১: ইসলামী আন্দোলনের মুজিবুর রহমান শামীম ঋণখেলাপি হওয়ায় বাতিল। নরসিংদী-৪: বাংলাদেশ কংগ্রেসের কাজি শরীফুল ইসলাম আপিলের পক্ষে পর্যাপ্ত কাগজপত্র না থাকায় বাতিল। এছাড়া হলফনামায় অসামঞ্জস্যতা। রংপুর-১: জাতীয় পার্টির মঞ্জুম আলীর দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে বাতিল করা হয়েছে। গোপালগঞ্জ-২: স্বতন্ত্র প্রার্থী রনী মোল্লার ভোটার সমর্থন অসামঞ্জস্যতায় প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। খুলনা-৬: স্বতন্ত্র প্রার্থী আছাদুল বিশ্বাস ভোটার সমর্থন প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় বাতিল। ঢাকা-৩: স্বতন্ত্র প্রার্থী মনির হোসেন ভোটার সমর্থনে অসামঞ্জস্য থাকায় বাতিল। ঢাকা-৩: জাতীয় পার্টি মো. ফারুকের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। ঢাকা-১৮: স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন হাওলাদারের মনোনয়ন বাতিল করা ঘোষণা করা হয়েছে। কক্সবাজার-৩: স্বতন্ত্র ইলিয়াছ মিয়ার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। ব্রাহ্মবাড়িয়া-৫: স্বতন্ত্র মুছা সিরাজীর প্রার্থিতা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। খুলনা-৩: স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুর বউফ মোল্লা অনুপস্থিত বলে তার প্রার্থিতা বাতিল। ব্রাহ্মবাড়িয়া-১: বিএনপির প্রার্থী এম এ মান্নান স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ একে একরামুজ্জামানের মনোনয়ন বাতিলের আবেদন মঞ্জুর। নাটোর-১: খেলাফত মজলিসের আজাবুল হকের মনোনয়ন দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে বাতিল। পাবনা-৩: গণঅধিকার পরিষদের হাসানুল ইসলামের মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।

বিবেচনাধীন যাদের আপিল

মুন্সীগঞ্জ-৩: স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিন ঋণখেলাপির দায়ে বিবেচনাধীন। পটুয়াখালী-৩: স্বতন্ত্র মিজানুর রহমান বাবুর মনোনয়ন বিবেচনাধীন। যশোর-৫: স্বতন্ত্র কামরুজ্জামান বিবেচনাধীন। কুমিল্লা-১: স্বতন্ত্র আবু জায়েদ আল মাহমুদ ভোটার সমর্থন ব্যর্থ হওয়ায় বাতিল করা হয়েছে।

রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন শুরু হয়েছে সোমবার থেকে। প্রথম দিন ৪২টি, দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার ১২২টি, তৃতীয় দিন বুধবার ১৩১টি, বৃহস্পতিবার চতুর্থ দিনে ১৭৪টি এবং শেষ দিনে অন্তত ১৭১টি আপিল জমা পড়েছে। এ নিয়ে পাঁচ দিনে মোট ৬৪০টি আপিল আবেদন হয়েছে। এরমধ্যে প্রার্থিতা ফিরে পেতে আবেদনই বেশি। ডজনখানেক আবেদন রয়েছে বৈধ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের দাবিতে।