আজ ৭ মার্চ শনিবার। ১৯৭১ সালের এদিন দিনে আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দান) দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। শেখ মুজিবের এই ভাষণকে আওয়ামী লীগের লোকজন ঐতিহাসিক দলিল বলে আখ্যা দেন। এবং আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবীরা এই ভাষণকে বিগত ফ্যাসিবাদী ১৭ বছর স্বাধীনতার ঘোষণা বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। অস্বাভাবিক বর্ণনা এবং স্তুতিবাদ করতে করতে এই ভাষণকে অলৌকিকতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে দেখা যায় এই ভাষণের ব্যবহার এতোটাই ভিন্ন খাতে নেওয়া হয় যে, এই ভাষণ হয়ে যায় স্বাধীনতার ঘোষণা। প্রকারান্তরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাকে অস্বীকার করার চেষ্টা করা শুরু হয়। দাবি করা হয়, শেখ মুজিবের এই ৭ই মার্চের ভাষণই স্বাধীনতার ঘোষণা।

আওয়ামী লীগ দাবি করে, একমাত্র ৭ ই মার্চের এই ভাষণে-ই ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি পেয়ে যায় স্বাধীনতার দিক-নির্দেশনা। তাতেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। তবে ৭ই মার্চের ভাষণ একটি ভাল এবং দিক নির্দেশনামূলক ভাষণ ছিল তাতে সন্দেহ নেই। তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে রাষ্ট্রীয় এবং আওয়ামী পন্থী প্রচার মাধ্যম ব্যবহার করে এই ভাষণের স্তুতি এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় যে, কেবলমাত্র এই ভাষণের কারণেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। কোন রকম মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন হয়নি। হাজার হাজার লাখো মুক্তিযোদ্ধার জীবন আর মা বোনের সম্ভ্রম দেওয়াটা ছিল বৃথা।

আওয়ামী লীগের ভোগ করা অবৈধ ক্ষমতার সহযোগী এবং আওয়ামী দালাল কবিরা এই ভাষণকে ঘিরে কবিতা লেখার প্রতিযোগিতায় নেমে যায়। বুদ্ধিজীবীরা স্তুতিগান লিখতে লিখতে কলমের কালি শেষ করে দেয়। শিল্পীরা এই গান গাইতে গাইতে হয়রান হয়ে যায়। তাদের একটাই দাবি এই ভাষণ না দিলে দেশ পরাধীনতার জিঞ্জির থেকে কোনো দিন মুক্তি পেত না। পরবর্তীতে দেখা যায় ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর মাধ্যমে আর এই দিবস পালনের জন্য আওয়ামী লীগের লোকজন চাঁদাবাজির মহোৎসবে মেতে উঠে। এই ভাষণের অপব্যবহার করতে করতে মেতে ওঠে ফ্যাসিবাদে। খুন গুমের মাধ্যমে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোকে নিঃশেষ করে দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করে। পর পর কয়েকটি নির্বাচনে ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার জন্য অসংখ্য মানুষকে জেলে বন্দী করে রাখে। অনেক মানুষকে রেখে দেয় আয়না ঘরে।

আজকের বাস্তবতা হলো- ক্ষমতায় থেকে অতি বাড়াবাড়ি করা আওয়ামী লীগ আজ আর রাজনীতির মাঠে নেই। ক্ষমতায় থেকে আষ্ফালন করা শীর্ষ নেতাদের কেউ জেলে আবার কেউ পার্শ্ববর্তী দেশে বসে নিরবে নিভৃতে সময় পার করছেন। তাদের দাপটি হুমকি আর কারো চোখে পড়ে না। তাদের কার্যক্রম আজ বাংলাদেশের মাটিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত। আজ আর এই ভাষণকে ব্যবহার করার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রচার যন্ত্রকে ব্যবহার করতে পারছে না। আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরাও আজ আর হয়তো আষ্ফালন করার সাহস দেখাবে না। ৭ মার্চের ভাষণকে ব্যবহার করে আর কেউ চাঁদাবাজি কিংবা ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা লুটার বৃথা চেষ্টা করবে না।

আওয়ামী লীগের দাবি ৭ই মার্চের ভাষণে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে আনে বাঙালি জাতি। এই বিজয়ের মধ্যদিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

তথাকথিত আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করে যে, ১৯৪৭ সালে ধর্মীয় চিন্তা, সাম্প্রদায়িকতার মানসিকতা ও দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ২৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতিসত্ত্বা, জাতীয়তাবোধ ও জাতিরাষ্ট্র গঠনের যে ভিত রচিত হয় তারই চূড়ান্ত পর্যায়ে ৭ মার্চের ভাষণের পর ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকসহ সর্বস্তরের বাঙালি স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি প্রহণ করে।