ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজাবস বলেছেন, ২০২৬ সালের সংসদীয় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে এবং দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে; যা গণতান্ত্রিক শাসন এবং আইনের শাসন পুনরুদ্ধারের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করে। ইভারস আইজাবস বলেন, ‘ইইউর পর্যবেক্ষকরা ৮০৫টি ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছেন। গ্রহণযোগ্য এবং আইনের শাসন অনুসারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্বাচন কমিশন কাজ করেছে। যদিও, নারীদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর কথাবার্তা ছিল। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ তাদের আকাক্সক্ষা পূরণে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পর্যবেক্ষক মিশনের প্রাথমিক রিপোর্ট তুলে ধরার সময় তিনি এসব কথা বলেন। এছাড়াও নির্বাচন পরবর্তী এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ কথা বলেন কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন প্রধান ও ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম নানা আকুফো আদো।
ইভার্স ইজাবস বলেন, ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো, নির্বাচন সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক ছিল, একটি নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়েছিল; যা মূলত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং মৌলিক স্বাধীনতাকে ব্যাপকভাবে মর্যাদাপূর্ণ করে। বিক্ষিপ্ত স্থানীয় রাজনৈতিক সহিংসতা, যাইহোক না কেন, প্রায়শই ম্যানিপুলেটেড অনলাইন আখ্যান দ্বারা সৃষ্ট হয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্থ করে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে ও স্বচ্ছভাবে স্টেকহোল্ডারদের আস্থা বজায় রেখে এবং নির্বাচনের অখণ্ডতা সমুন্নত রেখে কাজ করেছে। মিশনটি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, নির্বাচনী আইনি কাঠামো গণতান্ত্রিক নির্বাচন পরিচালনার জন্য পরিচালিত হয় এবং ২০২৫ সালের সংশোধনী অন্তর্ভুক্তি এবং বিশ্বাসযোগ্যতাকে শক্তিশালী করে। আইনি নিশ্চয়তা বাড়ানোর জন্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা হ্রাস করে এমন ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করার জন্য আরও সংস্কার প্রয়োজন।
ইইউ মিশনের প্রধান বলেন, আমরা দেখেছি, সদ্য নিযুক্ত নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য একটি সক্রিয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে এবং আমরা লক্ষ্য করেছি, অন্তর্বর্তী সরকার এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডাররা কমিশনকে যে সমর্থন দিয়েছিলেন কমিশন স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করেছে, সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রশ্নের দ্রুত জবাব দিয়েছে, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য ভাগ করে নিয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গেছে।
ইভার্স ইজাবস বলেন, নারীরা জুলাই অভ্যুত্থানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিলেও নির্বাচনে তাদের উপস্থিতি মাত্র ৪ শতাংশ। ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানি, বৈষম্য হয়েছে নারীদের সঙ্গে৷ জাতীয় রাজনীতিতে নারীদের এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার স্পষ্ট অভাব লক্ষ্য করা গেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের বাদ দেওয়ার পুরনো প্রথা এখন পরিত্যাগ করার সময় এসেছে। প্রচারণার সময় ভীতি প্রদর্শন এবং বিশেষ করে নারী প্রচারকদের হয়রানি করার ঘটনা ঘটেছে।
ইইউ আরও বলেন, ৫৬টি প্রচারণা সংক্রান্ত সহিংস ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে শারীরিক আঘাত এবং প্রাণহানির মতো দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। কারসাজি করা অনলাইন বর্ণনা বা প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে রাজনৈতিক সহিংসতাকে উসকে দেওয়া হয়েছে যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ক্ষতি করে। ভুল তথ্য বা অপপ্রচার রোধে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো খুব ধীরগতিতে পদক্ষেপ নিয়েছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান বলেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণও হতাশাজনক। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নেতাদের ধৈর্য এবং শান্ত বয়বহারকে আমরা স্বাগত জানাই। নতুন সরকারের মানবাধিকার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতে কাজ করতে হবে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সমর্থকদের সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। গণতান্ত্রিক নির্বাচন এবং সুশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আরও কাজ করা প্রয়োজন।
নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছে-কমনওয়েলথ: কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রধান বলেন, কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে উত্তেজনার বিচ্ছিন্ন ঘটনা লক্ষ্য করেছে। আমরা সব অংশীদারদের নির্বাচন-পরবর্তী সময়কালে শান্ত ও শান্তিপূর্ণ আচরণ বজায় রাখা এবং প্রাসঙ্গিক আইনি মাধ্যমে যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তি করার জন্য উৎসাহিত করি।
মিশন প্রধান বলেন, ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হওয়ার জন্য আমি বাংলাদেশের জনগণ, নির্বাচন কর্মকর্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং অন্তর্বর্তী সরকারসহ বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের প্রশংসা করি।
তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ের নির্বাচনী চক্রের দিকে তাকিয়ে, আমরা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন-পরবর্তী পর্যালোচনা পরিচালনা করার জন্য উৎসাহিত করি, যাতে ভালো অনুশীলনের লক্ষ্যে সব পর্যবেক্ষকের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন প্রধান বলেন, বাংলাদেশের জনগণ তাদের আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছে। আমরা তাদের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতে ভাগাভাগিতে উদার এবং ঐক্যবদ্ধ হতে উৎসাহিত করি।