মিল মালিকদের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেলে এ শিল্পে কর্মরত ২ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারি ও ৮ লাখ শ্রমিক বেকার হবে। এত সংখ্যক শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারি বেকার হয়ে গেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট হবে। এ অবস্থায় স্পিনিং মিল চালু রাখার দাবি জানিয়েছে এ শিল্পে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারিরা। এ জন্য নগদ প্রণোদনা, ফ্রি অব কস্ট (এফওসি) সীমা হ্রাসে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এ খাতে কর্মকর্তরা।
গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে স্পিনিং মিলে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারিরা সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যমুনা গ্রুপের পরিচালক ও বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্কেটিং প্রফেশনালস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার এবিএম সিরাজুল ইসলাম, মোশাররফ গ্রুপের পরিচালক (অপারেশন) ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক, স্পিনিং কনসালটেন্ট ইঞ্জিনিয়ার আবুল কালাম আজাদ, গেটকো গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক রুহুল আমিন আশিক প্রমুখ।
লিখিত বক্তব্যে সালমা গ্রুপের প্রধান পরিচালক কর্মকর্তা (সিওও) আজহার আলী বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে ২২ জানুয়ারি মিল মালিকরা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কারখানা বন্ধ রাখার আলটিমেটাম দিয়েছে। উদ্ভূত এ পরিস্থিতিতে এ শিল্পে কর্মরত শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারিরা উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কগ্রস্ত। বর্তমানে এ শিল্পে প্রায় ২ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারি ও ৮ লাখ শ্রমিক কর্মরত আছে। পহেলা ফেব্রুয়ারি মিল বন্ধ হয়ে গেলে এসব শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারিরা বেকার হয়ে যাবে। এত সংখ্যক শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারি বেকার হয়ে গেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ স্পিনিং খাত দীর্ঘদিন ঘরে নীতিগত বৈষম্য, অতিরিক্ত বন্ড সুবিধার উপর নির্ভরশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে সংকটের মুখে পরেছে। এই শিল্পের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান এবং ভবিষ্যত টেকসই নীতিমালা প্রণয়নের জন্য বিটিএমএ, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ এবং সরকারের সমন্বয়ে একটি কমিশন গঠন করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।
স্পিনিং মিল রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়ে আজহার আলী বলেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুতার দামের সামঞ্জস্য রাখার জন্য কমপক্ষে দুই বছরের জন্য ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়া উচিত। এছাড়া এফওসি সুবিধা ১৫-২০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। কিন্তু বর্তমানে ৫০ শতাংশ চালু আছে। অতিরিক্ত এফওসি চালু থাকলে ব্যাকওয়ার্ড সব টেক্সটাইল খাত ধ্বংস হয়ে যাবে। ব্যাকওয়ার্ড শিল্পগুলোর সক্ষমতা যাচাই পূর্বক পর্যায়ক্রমে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের জন্য একটি কার্যকর নীতিমালা দ্রুত তৈরি করতে হবে। যাতে আগামী ৪-৫ বছরের মধ্যে গার্মেন্টস শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ডাইজ কেমিক্যাল এবং স্পিনিং ও উইভিং এর স্পেয়ার পার্টস উৎপাদনের শিল্প দেশে গড়ে উঠতে পারে।
ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলো যেখানে একদিনের ব্যবধানে নীতি গ্রহণ করে, বন্দর বন্ধের মতো সিদ্ধান্ত নেয়। সেখানে গত ২ বছর যাবৎ সাধারণ একটি নীতির জন্য স্পিনিং মিলগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আর আমাদের এক মন্ত্রণালয় আরেকটিকে পক্ষকে দোষারোপ করছে। এ কারণে উদ্যোক্তাদের মাঝেও বিভাজন তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বন্ড সুবিধা আজীবনের জন্য চলতে পারে না। এক সুতা লাগলে ১০ টন সুতা আমদানি করে বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। এ কারণে স্থানীয় মিলগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। অনেক আগেই স্থানীয় মিলগুলো ১০-৩০ কাউন্টের কটন সুতা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে।
যমুনা গ্রুপের পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এবিএম সিরাজুল ইসলাম বলেন, গত দুই বছর যাবৎ মিলগুলো ৫০ শতাংশ সক্ষমতা নিয়ে চলছে। এভাবে চলতে থাকলে ওভারহেড খরচ বৃদ্ধি পাবে। উৎপাদন কমতে থাকলে লোকসান দিয়ে কারো পক্ষেই কারখানা চালানো সম্ভব নয়। শিল্পের অবস্থা কোন পর্যায়ে গেলে একজন মালিক মিল বন্ধের ঘোষণা দেয় তা সরকার অনুধাবন করতে পারছে না।
তিনি আরও বলেন, একটা শিল্পকে ধ্বংস করে আরেকটা শিল্পকে সুবিধা দেওয়া অনুচিত, এটা বিটিএমএ, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ’র নেতাদের বোঝা উচিত। টেক্সটাইল মিল মালিকরা বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র প্রতিপক্ষ নয়, একে অন্যের পরিপূরক। তাই সরকারকে দ্রুততার সঙ্গে এ খাত রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এবিএম সিরাজুল ইসলাম বলেন, বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি নিয়ে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে। যা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। ইতোমধ্যেই আমরা বিটিএমএ নেতাদের সঙ্গে দেখা করে মিল বন্ধ না করার অনুরোধ জানিয়েছি। আমরা চাই বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ’র নেতারা আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধান করুক। কোন অবস্থায় কারখানা বন্ধের পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়।