জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণার সম্ভাব্য তারিখ ১৩ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারা দেশে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের গুজব ও অপপ্রচার। যার মধ্যে রয়েছে গণসমাবেশ ঘটিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, লকডাউন ঘোষণার গুজব, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগের প্রচারণা।
পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাসূত্রগুলো জানিয়েছে-যেসব খবর আসছে সেগুলো আমলে নিয়ে তারা প্রস্তুত রয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, রাজনৈতিক কার্যালয় ও কৌশলগত মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। র্যাব জানিয়েছে, তাদের ১০ হাজার সদস্য এবং ১৫ ইউনিটকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানিয়ছে, তাদের সাদা পোশাকে তাদের সব কটি ইউনিট ততপর আছে। প্রতিদিনই ডিবি-পুলিশের অভিযানে নিষিদ্ধ দল আওযামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা গ্রেফতার হচ্ছে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী সন্দেহ হলেই তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এছাড়াও সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত অভিযান চলমান আছে।
আগামী ১৩ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার দিন ঠিক করা হবে। রায়ের দিন ঠিক করাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন মহল থেকে মন্তব্য করা ও কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১৩ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এছাড়া গণসমাবেশ ঘটিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, লকডাউন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগের প্রচারণাও চালিয়েছে দলটি। আশঙ্কা আরও উস্কে দিয়েছে গত ৫ নভেম্বর আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের দেয়া একটি ভিডিও বার্তা। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এই নেতা লকডাউন’-এর ঘোষণা দিয়ে বলেন, ১৩ই নভেম্বরকে সামনে রেখে আপনারা ঐক্যবদ্ধ হোন।
এদিকে গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোহাম্মদ মনোয়ার হোসাইন তামিম জানিয়েছেন, ১৩ নভেম্বর শেখ হাসিনার মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণা নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। তিনি বলেছেন, রাজনীতিতে যা-ই হোক, ১৩ নভেম্বর শেখ হাসিনার মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণা নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। এ ছাড়া ১৩ নভেম্বর রায় ঘোষণা করা হবে না। ওই দিন কবে রায় ঘোষণা করা হবে, সেই দিন ঠিক করা হবে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, বিচ্ছিন্নভাবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পরিচয় গোপন রেখে অবস্থান করছেন। সুযোগ পেলেই তারা সংগঠিত হয়ে ঝটিকা মিছিল করবে। তবে খুব বড়ভাবে একত্রিত হয়ে কোনো ধরনের নাশকতা করার সুযোগ পাবে না। কারণ সারা দেশেই পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা ও সেনা সদস্যরা সতর্ক রয়েছেন। সাইবার নিয়ে কাজ করেন পুলিশের এমন কর্মকর্তারা বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোন কোন আইডি থেকে গুজব ছড়ানো হচ্ছে সেসব আইডি শনাক্ত করা হচ্ছে। তবে বেশির ভাগ আইডি ও পেজ দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হওয়ার কারণে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলটির শীর্ষ নেত্রীর রায় ঘিরে তারা কিছু কর্মসূচি দিতেই পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সতর্ক থাকতে হবে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত কিছু গ্রুপ চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নতুন অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ এখনো বিভিন্ন উপায়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা বাসে অগ্নিসংযোগসহ নাশকতার পরিকল্পনা করছে, তবে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নজরদারিতে রয়েছে।
এদিকে ঢাকা জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে নাশকতার পরিকল্পনায় জড়িত সন্দেহে ৩১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজধানীতে রাজনৈতিক কার্যক্রম–নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ২৫ নেতা–কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল রোববার সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান। শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিসি তালেবুর রহমান। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানান ডিসি তালেবুর।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত কিছু গ্রুপ চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নতুন অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ এখনো বিভিন্ন উপায়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা বাসে অগ্নিসংযোগসহ নাশকতার পরিকল্পনা করছে, তবে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নজরদারিতে রয়েছে।
র্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী গতকাল রোববার দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, সোস্যাল মিডিয়া থেকে যেসব খবর পাওয়া যাচ্ছে তা তো উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। র্যাবের ১০ হাজার সদস্য প্রস্তুত রাখা হয়ছে। কখনো কিছু ঘটলে যেনো প্রতিহত করা যায় সে ব্যাপারে প্রস্তুত আছে র্যাব। তিনি বলেন, র্যাবের যে সাইবার মনিটরিং সেল এবং পাশাপাশি গোয়েন্দা ইউনিট এই দুইটা ইউনিট সার্বক্ষনিক বাবে কাজ করে যাচ্ছে। কোনো তথ্য পাওয়া মাত্রই তা যাচাই বাছাই করে তাক্ষনিক প্রতিহত করতে পারে সে জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এর পাশাপাশি র্যাবের মহাপরিচালকের পক্ষ থেকে মূখপত্র হিসেবে দেশবাসির উদ্দেশ্যে কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, আতঙ্কিত হওয়ার মতো বিষয় নেই। যদি কেউ কোথাও কোনো তথ্য পান বিভ্রান্ত না হয়ে পার্শ^বর্তী র্যাপিড আ্যাকশন ব্যাটালিয়ান অফিসকে জানাবেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ডিজির পক্ষ থেকে দেশব্যাপারী র্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়ানকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেয়া আছে এবং তারা প্রস্তুত রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি প্রধান) শফিকুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন পেজ ও আইডি থেকে এই ধরনের তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এগুলো দেশের বাইরে থেকে পরিচালনা করা হচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির কোনো কার্যক্রম করার সুযোগ নাই। আমরা আইনি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। আগেও আমরা অনেক নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করেছি। আর চলমান ইস্যু নিয়ে আমরা তৎপরতা বাড়িয়েছি। আমাদের সাইবার টিমও এ নিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গোয়েন্দা পুলিশের অভিযান অব্যহত আছে।