দুই সপ্তাহ ধরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। শ্বাসনালির সংকট, ফুসফুসের সংক্রমণ এবং হৃদযন্ত্রের জটিলতা মিলিয়ে তার শারীরিক অবস্থা এখনো নাজুক। চিকিৎসকরা বলছেন, পরিস্থিতিতে গুরুতর স্থিতিস্থাপকতা থাকলেও বিদেশে নেওয়ার মতো স্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। শনিবার রাতে চিকিৎসক বোর্ড তাদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত জানায়।

জানা গেছে, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি আগেই শুরু হয়েছিল। সেই উদ্দেশ্যে বিমান যোগে নেওয়ার পরিকল্পনাও করা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ে কাতার থেকে আকাশপথে পাঠানো বিশেষ বিমান ঢাকায় পৌঁছাতে পারেনি। জার্মানি থেকে নতুন উড়োজাহাজ ভাড়া করা হলেও তার আগেই যাত্রা সম্ভব নয়। সব ঠিক থাকলে ১০ ডিসেম্বর বেগম জিয়াকে লন্ডনে নেওয়া হতে পারে। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে চিকিৎসকদের অনুমোদনের ওপর।

এদিকে খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় যুক্ত হয়েছেন দেশের বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও চীনের চিকিৎসক দল। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েই তার জন্য চলমান চিকিৎসা পদ্ধতি পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকেরা প্রতিটি সিদ্ধান্তই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিচ্ছেন।

তার শারীরিক বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে বিএনপির ভেতরেও উদ্বেগ বাড়ছে। দলের অনেকেই মনে করছেন, খালেদা জিয়া বিদেশে যেতে না পারলে এবং পুনরায় সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

চিকিৎসক বোর্ড জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার অবস্থা এখনো অস্থির। তার বিদেশযাত্রার কথা বলা হলেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরিকল্পনা পিছিয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ১০ ডিসেম্বর তাকে লন্ডনে নেওয়া হতে পারে।

তবে গতকাল বেলা ১২টার দিকে খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব এবি এম আব্দুস সাত্তার বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার বিষয়ে এখন ফাইনাল কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। দেশজুড়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা দোয়া মাহফিলে অংশ নিচ্ছেন এবং দ্রুত আরোগ্য কামনা করছেন। একই সঙ্গে দলের ভেতর থেকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। এখন নজর সবই চিকিৎসা-বোর্ডের পরবর্তী সিদ্ধান্তে। তারা যদি তাকে বিমানযাত্রার উপযুক্ত ঘোষণা করেন, তাহলে দ্রুত লন্ডনের পথে নেওয়া হবে। সেখানে উন্নত চিকিৎসায় তার শারীরিক স্থিতি কতটা ফেরানো যায়, সেটিই নির্ধারণ করবে তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পথচলার দিকনির্দেশনা।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে তৃতীয়দিনের মতো দেখতে হাসপাতালে গেছেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। রোববার বিকেল পৌনে ৪টার দিকে তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে যান।

এ দিকে গতকাল বিকেলে এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত আছে। তবে শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে বিদেশে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হবে। তিনি জানান, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত। তবে তাকে দেওয়া চিকিৎসা তিনি গ্রহণ করতে পারছেন। চিকিৎসকদের আশা, নতুন করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থার অবনতি না হলে তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, বেগম জিয়ার চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাকে বিদেশ পাঠানোসহ পরিবারের অনুরোধ মোতাবেক সরকার যথাযথ সহায়তা করে যাচ্ছে। শফিকুল আলম আরও বলেন, খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনায় দেশবাসীকে দোয়া অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে সরকার।

এদিকে গতকাল দুপুরের পর থেকে হাসপাতালের সামনে নেতাকর্মীদের তেমন ভিড় করতে দেখা যায়নি। শুধু কিছু পথচারীকে সেখানে থাকতে দেখা গেছে। নেতাকর্মীদের উপস্থিতি না থাকলেও নিরাপত্তায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সংবাদমাধ্যম কর্মীরা উপস্থিত আছেন।

গত ২৩ নভেম্বর থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ভর্তি আছেন। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ফুসফুসে ইনফেকশন ধরা পড়ায় তার অবস্থা সংকটময় বলে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়। পরে খালেদা জিয়াকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) নিয়ে চিকিৎসকরা নিবিড়ভাবে চিকিৎসা দিচ্ছেন।