খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবস্থাকে দেশি বিদেশী চিকিৎসকেরা এখনো গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করছেন। তাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, আগামী কয়েকটি দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিডনি কার্যক্ষমতায় স্থিতিশীলতা ছাড়া তার সামগ্রিক শারীরিক অবস্থায় স্থায়ী উন্নতি আসা কঠিন। তাই এ অবস্থায় বেগম জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না চিকিৎসকরা। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ হোসেনও জানিয়েছেন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করছে তার বাইরে যাওয়া। জানা গেছে, তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত দেশেই চিকিৎসা চলবে। তাই আপাতত সাবেক এই তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে বিদেশে নেযা হচ্ছে না এটা নিশ্চিত।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, তার ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের সমস্যা কিছু সময় নিয়ন্ত্রণে থাকলেও হঠাৎ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ কারণে তার সার্বিক অবস্থা স্থিতিশীল বলা যাচ্ছে না। সর্বশেষ পরীক্ষায় কিডনি ও ফুসফুসের অবস্থার কিছুটা অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে এসব উন্নতি সামগ্রিক ঝুঁকি কমাতে যথেষ্ট নয়। তিনি এখনো আশঙ্কামুক্ত নন বলেই চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। এই অনিশ্চিত অবস্থার কারণে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর সম্ভাব্য তারিখ বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে। শুরুতে বিএনপি জানিয়েছিল, খালেদা জিয়াকে ভোরে লন্ডনে নেওয়া হবে। পরে শুক্রবার সকালে নতুন তারিখ দেওয়া হয় ৭ ডিসেম্বর। রাতে আবার জানানো হয়, সম্ভাব্য যাত্রার তারিখ পিছিয়ে ৯ অথবা ১০ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল সোমবার জানা গেছে, আপাতত লন্ডন যাওয়া হচ্ছে না খালেদা জিয়ার। উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত দেশেই তার চিকিৎসা চলবে।
সূত্র মতে, গতকাল পর্যন্ত প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী নতুন কোনো উন্নতি বা অবনতি কোনোটিই লক্ষণীয় নয়। সবকিছু অনেকটা অপরিবর্তিত রয়েছে।
বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে নিয়মিত দেখভাল করছেন পুত্রবধূ তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান। ঢাকায় আসার পর থেকে নিয়মিত তিনি শাশুড়ির শয্যাপাশে সময় কাটাচ্ছেন। গতকালও দেখতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে এসেছেন তিনি। সোমবার বিকেল ৩টা ৩৩ মিনিটে তিনি হাসপাতালে পৌঁছান। তিনি চিকিৎসকদের কাছে তার সবশেষ অবস্থার আফডেট নেন।
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবস্থা আগের মতো অপরিবর্তিত আছে বলে জানিয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) চিকিৎসার অংশ হিসেবে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। ডা. জুবাইদা রহমান চিকিৎসক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ম্যাডামের চিকিৎসার বিষয়টি দেখভাল করছেন।
এদিকে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ঘিরে এভারকেয়ার হাসপাতাল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এএসএফ), প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে হাসপাতালের প্রধান ফটক।
৮১ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, কিডনির জটিলতাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে গত ২৩ নভেম্বর দ্রুত তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। মেডিকেল বোর্ডের দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসা চলছে।
এদিকে বেগম খালেদা জিয়াকে লন্ডনের হাসপাতালে নিতে কাতারের ব্যবস্থা করা এয়ার অ্যাম্বুলেন্স মঙ্গলবার সকাল ৮টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার অনুমতি নিয়েছিল। তবে গতকাল সেই অনুমতি প্রত্যাহার চেয়ে আবেদন করেছে তারা। অর্থাৎ মঙ্গলবার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি আসছে না এবং খালেদা জিয়াও আপাতত লন্ডন যাচ্ছেন না। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, জার্মানিভিত্তিক এফএআই এভিয়েশন গ্রুপ স্থানীয় সমন্বয়কারী সংস্থার মাধ্যমে পূর্বের স্লট অনুমোদন প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। এটি আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি আপাতত আসছে না বলে তিনি নিশ্চিৎ করেছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত আসেনি।
এর আগে রোববার জমা দেওয়া অপারেটরের প্রাথমিক আবেদনের ভিত্তিতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি মঙ্গলবার সকাল ৮টায় অবতরণ ও একই দিন রাত ৯টার দিকে উড্ডয়নের অনুমোদন নিয়েছিল। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি কাতার সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় জার্মানিভিত্তিক এফএআই এভিয়েশন গ্রুপ থেকে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। এটি বোমবার্ডিয়ার চ্যালেঞ্জার ৬০৪ মডেলের একটি বিজনেস জেট যা দীর্ঘ দূরত্বের মেডিকেল ইভাকুয়েশনের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। চ্যালেঞ্জার ৬০৪ তার শক্তিশালী ট্রান্সকন্টিনেন্টাল সক্ষমতার জন্য পরিচিত, যা ঢাকা-লন্ডন মেডিকেল ট্রান্সফারের জন্য উপযোগী।