ঢাকার উপকণ্ঠে জনসমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি মানুষ ও দেশের জন্য একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন। এই পরিকল্পনার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ১৭ বছরের অপেক্ষা। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফেরেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান। তাকে স্বাগত জানাতে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখ লাখ নেতাকর্মী ও সমর্থক সমাবেশে অংশ নেন। সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, আমরা শান্তি চাই। এই দেশে পাহাড় ও সমতলের মানুষ আছে। আরও আছে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ। আমরা এমন একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে নারী-পুরুষ ও শিশুরা নিরাপদে ঘর থেকে বের হয়ে আবার নিরাপদে ফিরতে পারবে।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে প্রত্যাবর্তন: তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা বেড়েছে। তরুণ নেতা ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে দুটি শীর্ষ দৈনিক পত্রিকার কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ এবং এক হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটে। এছাড়া আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপিকে আসন্ন নির্বাচনে এগিয়ে থাকা দল হিসেবে দেখা হচ্ছে, আর তারেক রহমানকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সহিংসতার কারণে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও জল্পনা ছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও বক্তব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ সুগম করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, তার আগমন একটি নতুন সম্ভাবনার জানালা খুলে দিয়েছে। এতে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কমবে এবং দেশ যে স্থিতিশীলতা খুঁজছে, তার দিকে অগ্রসর হবে।

নেতৃত্বের পরীক্ষায় তারেক রহমান: বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ থাকায়, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তারেক রহমানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও নির্বাসন শেষে তার দেশে ফেরা নিয়ে বেশ কিছুদিন কিছুটা অনিশ্চয়তা ছিল। অধ্যাপক শাহান বলেন, এখন মূল প্রশ্ন হলোÑ তিনি কি কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারবেন? তিনি যদি চরমপন্থার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন, জনগণের উদ্বেগ বোঝেন এবং দলীয় কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, তাহলে রাজনৈতিক পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হবে। অন্যথায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।

জনসমর্থন ও সাংগঠনিক শক্তি: ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক ও উন্নয়ন গবেষণা উদ্যোগের (এইচএডিআরআই) গবেষক মুবাশশার হাসানের মতে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে যে জনউদ্দীপনা দেখা গেছে, তা কেবল বিএনপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার প্রত্যাবর্তনে আগ্রহ দেখিয়েছে। গত ১৬ মাসের অস্থিরতার পর অনেকেই বিএনপিকে একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে দেখতে চাইছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশত্যাগের পর নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগে সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে।

মামলা প্রত্যাহার ও ‘দ্বিতীয় সুযোগ’: ২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে হত্যা ও দুর্নীতিসহ একাধিক মামলা হয়। সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তার বিরুদ্ধে মামলা ও পরবর্তীতে অনুপস্থিতিতে দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গত দেড় বছরে এসব মামলা প্রত্যাহার ও দণ্ডাদেশ স্থগিত করা হয়, যা তার দেশে ফেরার পথ খুলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক শাফকাত রাব্বি বলেন, তারেক রহমান নীতিনির্ধারণে আগ্রহী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। গত বৃহস্পতিবারের ভাষণেও তিনি বারবার বলেছেন তার, একটি পরিকল্পনা আছে।