# খেলাপি ঋণের সংকট কাটিয়ে উঠতে অন্তত ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে : বি বি গভর্নর

# ব্যবসায়ীদের বিষয়ে আমাদের ধারণা পাল্টাতে হবে : মির্জা ফখরুল

# জন আকাক্সক্ষা উপেক্ষিত হলে নতুন করে অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি হতে পারে: নাহিদ ইসলাম

দেশের ব্যবসার পরিবেশ টেকসই করতে তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি এই তিন জায়গা ঠিক হলে দেশ পাল্টে যাবে। এক নম্বর শিক্ষা; তবে সনদ দেওয়া শিক্ষা নয়; প্রফেশনাল এডুকেশন দিতে হবে। কৃষক থেকে শুরু করে সবাই হবে একেক জন রিসোর্স ও দক্ষ পারসন। দুই নম্বর বিষয় হলো দুর্নীতি প্রতিরোধ: দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে গিয়ে আমরা ডাল বা পাতা ধরে টান দিই কিন্তু মূল থেকেই যায়। আমাদের তৃতীয় বিষয় হলো ন্যায়বিচার সর্বত্র এবং সবার জন্য। এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের ব্যবসায় হবে টেকসই। জাতি হবে প্রগ্রেসিভ ও ডায়নামিক। এটা নিশ্চিত করতে না পারলে সমাজ ভালোর দিকে আগাবে না।

গতকাল শনিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁ হোটেলে আয়োজিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন। ‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ বিষয়ক এই সম্মেলনের আয়োজন করে একটি জাতীয় দৈনিক।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সমাজে চাঁদা ও দুর্নীতি ব্যবসায়ীদের এমনভাবে নিরুৎসাহিত করছে যে, তারা সামর্থ্য থাকার স্বত্বেও অনেকে ব্যবসায় স্থাপনের চিন্তা করে না। তিনি বলেন, রাজনীতির জায়গা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আমরা ব্যবসায়ীদের জন্য কাক্সিক্ষত কমফোর্ট জোন তৈরি করতে পারিনি। এ জন্য রাজনীতিবিদদের দায় রয়েছে বলে মনে করেন জামায়াত আমীর। অনুষ্ঠানে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এ দেশের অর্থনীতিতে গরিব-দুঃখী সবাই অবদান রেখে যাচ্ছে। আমাদের টোটাল ডেভেলপমেন্ট দুটো বড় খাত থেকে আসে; একটা বিভিন্ন পর্যায়ের ট্যাক্স, আরেকটা রেমিট্যান্স। ভিক্ষুক ও শিল্পপতি উভয়ই ট্যাক্স দেন।

যেহেতু সমাজের দায়িত্ব সবাই সমানভাবে নিচ্ছে, তাই অর্থনৈতিক বিষয়টিও ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। তা না হলে এই ক্ষেত্রে অবিচার হবে, সেই অবিচার এরই মধ্যে সমাজে চলছে। এ ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত নেই; কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।’

জামায়াত আমীর বলেন, অর্থনীতি নিয়ে আপনি আগাবেন কীভাবে ? এই অর্থনীতিতে যেমন বিভিন্ন সরকারি মার-প্যাঁচ, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আছে, তেমননিভাবে সেখানে অনেক দুর্বৃত্তপনাও আছে। ক্ষেত্রবিশেষে এই দুর্বৃত্তপনাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে রাষ্ট্র। ফলে যে উদ্যোক্তার পাঁচ বছরের মধ্যে সফলতার মুখ দেখার কথা ছিল সেটা ১০ বছর গড়িয়ে চলে যাচ্ছে।

চাঁদা ও দুর্নীতি ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করছে মন্তব্য করে জামায়াত আমীর বলেন, সামর্থ্য থাকা স্বত্বেও অনেকে ব্যবসায় স্থাপনের চিন্তা করে না। উল্টো যে ব্যবসাটা আছে সেটাকে বাঁচাবে কীভাবে তা নিয়েই ত্রাহি অবস্থা। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ করতে আহ্বান জানালে তারা জবাব দেয়, আমাদের দেশ স্ট্যাবল না, অনেক বেশি লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, জীবন ও মূলধনের হুমকি বিদ্যমান। বিপরীতে অনেক দেশ আছে যারা আমাদের উপযুক্ত পরিবেশ দেবে। (তারা বলে) তোমরা ভালো পরিবেশ দাও, আমরা আসব।’

ব্যবসায়ীদের রাজনীতি প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘অনেক সময় ব্যবসায়ীদের বলা হয় সুবিধাবাদী। যখন যে দল ক্ষমতায় যায়, তখন সে দলের পেছনে লাইন দেয়। আমি মনে করি কেউ লাইন দেয় নিজের আগ্রহে কেউ লাইন দেয় বাধ্য হয়ে। আর লাইন দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না; ব্যবসাকে বাঁচাতে পারে না। এটা তাদের দায় নয়; এই দায় আমার; আমাদের রাজনীতিবিদদের। রাজনীতির বাইরে কোনো অর্থনীতি নেই। ব্যবসায়ীরা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ আখ্যায়িত করে জামায়াতে ইসলামীর এই শীর্ষ নেতা বলেন, রাজনীতির জায়গা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আমরা কাক্সিক্ষত কমফোর্ট জোন ব্যবসায়ীদের জন্য তৈরি করতে পারিনি। তবে কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতে হবে।

দেশের মেধা পাচারের বিষয়ে জামায়াত আমীর বলেন, ‘আমাদের মেধাগুলো দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গায় চলে গেছে। সেখানে তারা চমৎকার ভূমিকা রাখছে, নিজেদের মেলে ধরছে। আমার দেশে তারা পারে না কেন? কারণ, আমরা সেই পরিবেশ তাদের দিতে পারিনি। ফলে আমাদের মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে। তাদের যদি একটু সম্মানের জায়গা তৈরি করে দিতে পারি তাহলে তারা আসবে। এই দেশকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ক্ষেত্রবিশেষে তারা নেতৃত্ব দিতে পারবে।

জামায়াতের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে জামায়াত আমীর বলেন, আমাদের ফোকাস তিনটা জায়গায়। আমরা বিশ্বাস করি এই তিন জায়গা ঠিক হলে দেশ পাল্টে যাবে। এক নম্বর শিক্ষা; তবে সনদ দেওয়া শিক্ষা নয়; প্রফেশনাল এডুকেশন দিতে হবে। কৃষক থেকে শুরু করে সবাই হবে একেক জন রিসোর্স ও দক্ষ পারসন। দুই নম্বর বিষয় হলো দুর্নীতি প্রতিরোধ। দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে গিয়ে আমরা ঢাল বা পাতা ধরে টান দিই কিন্তু মূল থেকেই যায়। আমাদের তৃতীয় বিষয় হলো ন্যায়বিচার সর্বত্র এবং সবার জন্য। এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের ব্যবসায় হবে টেকসই। জাতি হবে প্রগ্রেসিভ ও ডায়নামিক। এটা নিশ্চিত করতে না পারলে সমাজ ভালোর দিকে আগাবে না।

ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, এই জায়গা ঠিক হলে সমাজ ঠিক হবে; তবে একদিনে না। প্রথমে শুরু করতে হবে। তারপর ক্রমান্বয়ে এগিয়ে নিতে হবে। আমরা বিপ্লবী পরিবর্তনের দিকে নয়, বরং যৌক্তিক পরিবর্তনের দিকে যেন দেশটাকে এগিয়ে নিতে পারি সে দিকে নজর দিতে হবে। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে এ লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। অতীতে যা হওয়ার হয়েছে আগামীটাকে বিনির্মাণ করতে হবে।

দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে রাজনীতির সদিচ্ছা অপরিহার্য বলে মন্তব্য করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন, শিক্ষার আধুনিকায়ন, দুর্নীতি দমন এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। এছাড়া মেধাবী প্রজন্মকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্যও প্রয়োজন উপযুক্ত নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ।’

শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ছোট একটি জমি, যেখানে ১৮ কোটি মানুষ বাস করছে। এত বেশি জনসংখ্যা এত ছোট জায়গায় পৃথিবীর আর কোথাও নেই। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। যদি পরিকল্পনা না থাকে, ১৮ কোটি মানুষকে জনসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব নয়।

জামায়াত আমীর উল্লেখ করেন, ২৫ ভাগ মানুষ প্রাথমিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে ড্রপআউট হয়ে যায়। প্রান্তিক মানুষদের সন্তান স্কুলে বা মাদরাসায় যায় না, দুই-একটি ক্লাস পড়ার পর জীবিকার তাগিদে কাজে যুক্ত হয়। এতে তাদের মেধা দেশের কাজে লাগেনি। তবে তাদের মধ্যেও ভবিষ্যতের অর্থনীতির বড় অবদান রাখতে পারার সম্ভাবনা থাকে।

জামায়াতে ইসলামীর আমীর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বা চিফ এক্সিকিউটিভ হতে পারে এমন মানুষও ড্রপআউট হয়ে যাচ্ছেন। এ সমস্যা সমাধান করা সরকারের ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব। তবে তা হচ্ছে না, ফলে অর্থনীতির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত। উদ্যোক্তা নতুন কোনো ইন্ডাস্ট্রি শুরু করতে গেলে প্রথমে জমি নিতে হয়। কিন্তু সে হাজারো জটিলতায় বাধাপ্রাপ্ত হয়। এক মাসে সব ক্লিয়ার করতে চাইলেও এক বছরও সময় লাগে। কিছু ক্ষেত্রে দুর্বৃত্ত সহযোগিতা করে, রাষ্ট্রও নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করে। এতে উদ্যোক্তার পরিকল্পনা দেরিতে বাস্তবায়িত হয়।

শফিকুর রহমান বলেন, উদ্যোক্তারা ব্যাংক লোন নিয়েছে, কিন্তু যদি লোনের যথাযথ ব্যবহার না হয়, তা নন-পারফর্মিং হয়ে যাবে। সমাজের পক্ষ থেকে দুর্নীতি ও লালফিতার হুমকি ব্যবসায়ীদের প্ররোচিত করছে না। তাই আমাদের ব্যবসায়িক পরিবেশকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা করতে পারে। তিনি বলেন, এটি শুধু বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য নয়, দেশের সকল উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীর জন্য প্রয়োজন।

জামায়াত আমীর বলেন, অনেক সময় ব্যবসায়ীদের সুবিধাবাদী বলে মনে করা হয়। কেউ সরকারের সঙ্গে লাইন দেয় নিজের ইচ্ছায়, কেউ বাধ্য হয়ে। কিন্তু লাইন ছাড়া ব্যবসা এগোতে পারছে না। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাজনীতিবিদ ছাড়া কোনো অর্থনীতি ঠিকভাবে চলতে পারে না। রাজনীতি যদি ঠিক থাকে, ব্যবসা ও অর্থনীতি উন্নতি করতে পারে। দেশে কাক্সিক্ষত সুবিধা ও সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এখন তা তৈরি করা প্রয়োজন।

তিনি দেশকে এগিয়ে নিতে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। আগামী প্রজন্মের জন্য ভালো কিছু করার দায়িত্ব এখনই নিতে হবে। শফিকুর রহমান আরও বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশি মেধা সফলভাবে অবদান রাখছে। আমাদের দেশে জন্ম নেওয়া শিশু বিদেশে গিয়ে নিজেকে প্রকাশ করছে। দেশে কেন তা সম্ভব হচ্ছে না? দেশে পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে মেধাবীরা দেশে ফিরে আসতে পারে। তারা দেশের উন্নয়নে নেতৃত্ব দিতে পারবে। শফিকুর রহমান বলেন, অনেক ছাত্র বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে, কিন্তু ফিরে আসে না। এর কারণ হলো দেশ তাদের যথাযথ সম্মান ও নিরাপত্তা দিতে পারছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি বর্তমানে খেলাপি। ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া এ খেলাপি ঋণের সংকট কাটিয়ে উঠতে অন্তত ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে। আহসান এইচ মনসুর বলেন, এটি (খেলাপি ঋণ) ছোটখাটো কোনো সমস্যা নয়। খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি পুরো আর্থিক খাতকে চাপের মুখে ফেলে দিয়েছে। আমদানির জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ডলার রয়েছে।

দেশের খেলাপি ঋণ বাড়ছে জানিয়ে অনুষ্ঠানে গভর্নর বলেন, ‘প্রতি প্রান্তিকে যখন নতুন তথ্য পাই, খেলাপি ঋণের নতুন নিয়ম কার্যকর হয়। তখনই দেখা যাচ্ছে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। দুই বছর আগে আমার ধারণা ছিল ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশের মতো হবে। তখন সরকার বলেছিল তা ৮ শতাংশ। এখন দেখছি এটি ইতিমধ্যে ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। গভর্নর মনে করেন, এ পরিস্থিতি রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে বহুদিন এই সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। ধাপে ধাপে এগোতে হবে।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আমদানির ঋণপত্র খোলার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ডলার রয়েছে। ফলে এ বছর রমজানে ঋণপত্র খোলা ও পণ্য আমদানি নিয়ে কোনো শঙ্কা দেখছি না।’ ইতিমধ্যে গত বছরের এ সময়ের তুলনায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি ঋণপত্র খোলা হয়েছে বলে জানান তিনি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, ব্যবসায়ীদের বিষয়ে আমাদের ধারণা পাল্টাতে হবে। চোর ধরার চিন্তা থেকে বেরিয়ে বিশ্বাসের জায়গায় আসতে হবে। তাকে যদি বিশ্বাস না-ই করি তাহলে ব্যবসা করে তারা দেশের জন্য কী করবে। দেশ ছেড়ে পলাতকদের বন্ধ কারখানাগুলো আবার কীভাবে চালু করা যায় সেটি ভাবা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, গত ১৫ বছর যারা ব্যাংক লুট করেছে, দেশে লুটপাট করেছে, চুরি করেছেÑ তাদের ধরেন, শাস্তি দেন। কিন্তু তাদের যে শিল্পকারখানা আছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ কাজ করছে। আলোচনায় এসেছে ১৪ লাখ মানুষ কর্ম হারিয়েছে, তারা যাবে কোথায় ? আমরা এই বেকারত্ব সৃষ্টি করছি কেন ? আমি মনে করি বিষয়টি আমাদের ভেবে দেখা উচিত।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে আমাদের আরো বেশি কাজ করতে হবে। দেশের শিক্ষাখাতের অবস্থা ভালো না। এ খাতকে একেবারে ঢেলে সাজাতে হবে। আমরা সরকারে এলে এখানে বিশেষভাবে কাজ করব।

আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বিগত সরকার দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল, যেখানে মাফিয়া ও লুটেরা শ্রেণী ক্ষমতায় ছিল। এর ফলে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও আকাক্সক্ষা দীর্ঘদিন উপেক্ষিত হয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সমাজের বৃহত্তর জনগণের মধ্যে ঐক্য গড়ে ওঠায় জুলাইয়ের অভ্যুত্থান সংঘঠিত হয়। যেখানে তরুণরা ন্যায্য অধিকার ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রত্যাশায় সংগ্রামে নেমেছিল। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষা উপেক্ষিত হলে নতুন করে অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, গণ-অভ্যুত্থান রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের অংশ হলেও এর মূলে ছিল জনগণের সার্বিক উন্নতির আকাক্সক্ষা। বর্তমানে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ হলোÑকর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মহানগরগুলোর উঠতি মধ্যবিত্তের জীবন-জীবিকার সুরাহা। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মৌলিক সেবার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।

তিনি আরো বলেন, নতুন রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্তে নগরের গণপরিবহন, তরুণদের চাকরির সুযোগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রবাসীদের দেশের উন্নয়নে যুক্ত করার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রবাসীরা যুক্ত হতে আগ্রহী, তবে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে না তুললে স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমন ছাড়া কোনো উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, যদি সমাজে ফ্যাসিবাদী মনোভাব বজায় থাকে, তাহলে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে না। স্থায়িত্ব না থাকলে সংস্কার ও উন্নয়নও টেকসই হবে না। তিনি জানান, পাচার করা অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ চলছে এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারে তারা সচেষ্ট থাকবেন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক (ডিজি) ড. এ কে এনামুল হক বলেন, ব্যাপক বেকারত্বই গণঅভ্যুত্থানের মূল কারণ। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি অর্থনীতির মৌলিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর আরেফিন বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা বাজার এখন সম্পূর্ণরূপে চাহিদা ও সরবরাহ চালিত। বাজার এখন স্বাভাবিক নিয়মে চলতে শুরু করেছে।

আরেফিন বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য বাংলাদেশ অত্যন্ত ‘উর্বর’ একটি দেশ। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্রশংসার দাবিদার। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)- এর সভাপতি এবং জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গত পাঁচ-ছয় বছরে দেশের অর্থনীতি নানা সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভয়াবহ বন্যা এবং সর্বশেষ গণঅভ্যুত্থান।

তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা উদ্যোক্তাদের স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। তবে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রয়োজন। কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, নীতি সুদহার কমানো, বন্ড ও ইকুইটি বাজার উন্নয়নের মাধ্যমে পুঁজিবাজার শক্তিশালী করা এবং ক্যাশলেস লেনদেন আরও বাড়ানোর পক্ষে মত দেন তিনি।

এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান একে আজাদ আশা প্রকাশ করেন, পরবর্তী সরকার বেসরকারি খাতের সঙ্গে আরও বেশি পরামর্শের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবে। তিনি বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধি এবং অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।