রাতভর বৃষ্টির মতো ঝরে কুয়াশা। সকালের দিকেও কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে পথঘাট। ঘন কুয়াশায় যেন দৃষ্টিসীমাও সীমাবদ্ধ। সঙ্গে কনকনে শীতে কাবু পুরো জনপদ। জেলায় দিনের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৬ ডিগ্রির ঘরে। বইছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ।
শুক্রবার সকাল ৯টায় জেলার তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে ৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। যা চলতি মৌসুমে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, ৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে তাপমাত্রা বিরাজ করলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ ধরা হয়। সে হিসেবে এ এলাকার ওপর দিয়ে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
এর আগে, গত বৃহস্পতিবার একই সময়ে তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এদিন দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিছুদিন ধরেই এ অঞ্চলে শীতের তীব্রতা একটু বেশি। কনকনে শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। রাত বাড়তে থাকলে বাড়ে শীতের দাপট। সকাল অবধি ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকে পথঘাট। সেভাবে সূর্যেরও দেখা মেলে না।
এদিকে, কনকনে শীতে দুর্ভোগে রয়েছে খেটেখাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষেরা। সময়মতো কাজে যেতে পারছেন না শ্রমজীবীরা। বিপাকে যানবাহন চালকরাও। তাদের সকালের দিকেও হেডলাইট জ্বালিয়ে সাবধানে চলাচল করতে হচ্ছে। শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে অনেকেই খড়খুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষক জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, আজকে সকাল ৯টায় ৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ১০০ শতাংশ এবং গতিবেগ ছিল ১০-১২ কিলোমিটার। জানুয়ারি জুড়েই এমন শীত পরিস্থিতি থাকতে পারে।
এদিকে দেশের ২০ জেলার ওপর চলমান মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ আরও ২ দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, এ মাসের অন্তত মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত শৈত্যপ্রবাহ চলতে থাকবে। এ সময় এর বিস্তৃতি কমবেশি হতে পারে। আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের সব জেলায় শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি চার জেলা নরসিংদী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়াতেও বইছে শৈত্যপ্রবাহ। রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে জেলার সংখ্যা ১৬। সব মিলে ২০ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আগের দিন বৃহস্পতিবার দেশের ২৪ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ ছিল। এদিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। এর আগে গত বুধবার নওগাঁর বদলগাছীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি ছিল এই শীত মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।
আবহাওয়ার সিনপটিক অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপটি উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে একই এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরও উত্তপশ্চিম দিকে সরে গিয়ে আজ শনিবার দিকে উত্তর শ্রীলঙ্কা উপকূল অতিক্রম করতে পারে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ এবং তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থান করছে।
যশোরে একদিনে ১০ জনের মৃত্যু
যশোর সংবাদদাতা জানান, যশোরে চলমান তীব্র শীত ও শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে ঠাণ্ডাজনিত রোগ এবং ফুসফুস সংক্রমণে একদিনে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের বয়স ৫৫ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে বলে জানা গেছে। গতকাল শুক্রবার যশোর জেনারেল হাসপাতালের জরুর্রি বিভাগের চিকিৎসক ডা. জোবায়ের আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুস সংক্রমণজনিত জটিলতা মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এ কারণে মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে।
যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় মোট ২৯০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শতাধিক রোগী ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছিলেন। ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৫৪ জন শিশু রয়েছে। চিকিৎসকরা জানান, শিশু ও বয়স্করা শীতজনিত রোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, ঠাণ্ডার কারণে বয়স্কদের শ্বাসনালিতে সংক্রমণ, নিউমোনিয়া ও হৃদ্রোগের জটিলতা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক রোগী হাসপাতালে আনার আগেই মৃত্যুবরণ করছেন। চিকিৎসকরা সবাইকে ঘরে ও বাইরে চলাফেরার সময় যথাযথ শীতবস্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
মৃত স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুন্সি মহিউদ্দিনের ছেলে শামছুজ্জামান জানান, তীব্র ঠান্ডার কারণে তার বাবার শ্বাস নিতে মারাত্মক কষ্ট হচ্ছিল। শুক্রবার ভোর ৬টার দিকে তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তার বাবার মৃত্যু হয়েছে।
একইভাবে শেখ সদরুল আলমের ছেলে মামুন বলেন, তার বাবার আগে থেকেই হৃদ্রোগের সমস্যা ছিল। সাম্প্রতিক তীব্র শীতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। বৃহস্পতিবার রাতে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত মনিরা খাতুনের ছেলে শেখ মাসুম জানান, তার মায়ের বয়স ৬৪ বছর। প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে তিনি প্রায় ১০ দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে গুরুতর অবস্থায় তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শেখ মামুনের বাড়ির পাশেই বসবাসকারী ৬৫ বছর বয়সী সাবেক শিক্ষিকা উম্মে হানিও ঠান্ডাজনিত রোগে মারা গেছেন। তার ছেলে বনি জানান, এক সপ্তাহ ধরে তার মা ঠাণ্ডাজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন এবং হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। চিকিৎসকরা জানান, তার ফুসফুস মারাত্মকভাবে সংক্রমিত হওয়ায় মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাচ্ছিল না, যার ফলে তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েকদিন ধরে যশোরের ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ ও হিমেল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। ঘন কুয়াশা ও উত্তরের ঠান্ডা বাতাসের কারণে জেলার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া অফিস জানায়, শুক্রবার সকালে যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াাস।
আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, গত কয়েকদিন ধরে যশোরে তাপমাত্রা ৭ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। দিনের বেশিরভাগ সময় সূর্যের দেখা না পাওয়ায় শীতের তীব্রতা আরও বেড়েছে। এর ফলে জেলাজুড়ে ঠান্ডাজনিত নানা রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়াায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন, যা স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।