• সংসদের ভেতরে সমাধান না হলে রাজপথে নামবো- ডা. শফিকুর রহমান
  • সংবিধানে সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব নেই, জুলাই বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
  • বিএনপি একসময় গণভোটের প্রচার চালিয়েছে, এখন অবজ্ঞা করছে: নাহিদ ইসলাম

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে উত্তপ্ত হয়েছে জাতীয় সংসদ। গতকালই ছিলো সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহবানের শেষ দিন। কিন্তু আইন অনুযায়ী অধিবেশন আহবান না করায় বিরোধী দলের নেতা বিষয়টি জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে তুলে ধরেন। তখনই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে সংবিধান বর্হিভূত বলে আখ্যায়িত করা হয়। আর এ নিয়ে সংসদের এ অধিবেশনে আলোচনার সুযোগ কম। পরের অধিবেশনও বাজেট অধিবেশন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সেই সাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব সংবিধানে নেই এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকেও অবৈধ বলে আখ্যায়িত করা হয়। পরে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংবিধানের অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে জুলাই সনদ আদেশের আইনী ভিত্তি তুলে ধরেন।

গতকাল রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনেও উত্তপ্ত হয়ে উঠে সংসদ। এর আগে গত বৃহস্পতিবার নতুন সংসদের প্রথম দিন রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করার মাধ্যমে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।

গতকার জাতীয় সংসদের দিনের কার্যসূচী অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাড়িঁয়ে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সংসদ স্বাভাবিকভাবে তার নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় আসেনি। এটি একটি প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের মাধ্যমে এসেছে, যা ১৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি করা হয়। এই অর্ডারের ১৫টি নির্দেশিকার মধ্যে ৩ থেকে ১৫ নম্বর বিষয়গুলো ‘জুলাই সনদ’ এবং গণভোটের সঙ্গে সম্পর্কিত।”

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “অর্ডারের ১০ নম্বর নির্দেশিকায় বলা হয়েছেÑ ‘সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে, অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের প্রথম অধিবেশনও আহ্বান করা হবে।’ আমার কনসার্নের বিষয়টা এখানেই। আজকে ৩০তম পঞ্জিকা দিবস, কিন্তু এর মধ্যে এই অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি।”

সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সংসদ আহ্বান করেন। আমরা ধরে নিচ্ছি, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই রাষ্ট্রপতি সংসদের এই সভা আহ্বান করেছেন। অর্ডারে পরিষ্কার বলা আছে, যে পদ্ধতিতে সংসদের প্রথম অধিবেশন ডাকা হবে, একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভাও ডাকতে হবে।”

গণভোটের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আদেশের বিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে। আদেশে বলা ছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ সূচক হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠিত হবে, যা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে সব ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। মাননীয় স্পিকার, এটি হয়নি এবং এর সময়সীমা আজকে শেষ।”

সংসদ সদস্যদের দ্বৈত ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একসঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেনÑ আমরা এই সুযোগ পেতে চাই। আদেশের তফসিল অনুযায়ী, আমরা ৭৭ জন বিরোধীদলীয় সদস্য সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের পর একই অনুষ্ঠানে পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ গ্রহণ করেছি এবং অনুরূপ শপথপত্রে স্বাক্ষর দান করেছি।”

সংবিধান সংস্কারের সময়সীমা সম্পর্কে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে। এরপর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে। কিন্তু কাজ তো আগে শুরু হতে হবে, তারপর সমাপ্ত! পরিষদের কর্মধারায় অংশগ্রহণের সময় নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ দুইটা ক্যাপাসিটিতে (পরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্য) কাজ করবেন।”

অবিলম্বে প্রেসিডেন্সিয়াল আদেশের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান।

বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি সরকারি দল থেকে বক্তব্য আশা করছেন।

এরপর বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শুরুতে তিনি স্পিকারের কাছে প্রশ্ন রাখেন কোন বিধিতে বিরোধীদলীয় নেতাকে ফ্লোর দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যদি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো মুলতবি প্রস্তাব আনতে হয়, সেটার জন্য বিধি আছে। সেই বিধিতে কোনো নোটিশ তিনি দিয়েছেন কি না। যদি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে হয়, সেই বিষয়ে বিধি ৬৮ অনুসারে কোনো নোটিশ দিয়েছেন কি না।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদের অধিবেশন না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংবিধানের ধারা পরিবর্তন হবে বা সংবিধান পরিবর্তন হবে, এ রকম কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না। সেটা জায়েজ নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু এই যে আদেশ (জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ), এই আদেশটা না অধ্যাদেশ, না আইন। মাঝামাঝি জিনিস, সেদিন আমি বলেছিলাম, এটা হয়তো নিউটার জেন্ডার হতে পারে।’

এই আদেশটিকে ‘আরোপিত’ আদেশ উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দুটি কাজ বাদে সবগুলো প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করে থাকেন। একইভাবে এই সংসদের আহ্বানও তিনি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী। কিন্তু সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রীও সেটা রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও সেই অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন না বিধায় তা করেননি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখন যদি বিরোধী দলের প্রশ্ন অনুসারে রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশটা সাংবিধানিক হয়, সেটা নিয়ে এখানে আলোচনা হতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ এইটা এবং গণভোট অধ্যাদেশের নির্দিষ্ট অংশ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না মর্মে আদালত রুল জারি করেছেন। এখানে হয়তো বিচার বিভাগ মতামত দেবে। কিন্তু তাদের মতামত এই সার্বভৌম সংসদের ওপর কখনো বাইন্ডিং (বাধ্যতামূলক) না। কিন্তু সার্বভৌম সংসদ আবার এমন কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না, যেটা জুডিশিয়ারিতে গিয়ে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল হয়ে যাবে বা ভায়োলেশন অব কনস্টিটিউশন হয়ে যাবে। সুতরাং উভয় দিকে লক্ষ রেখে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আইনানুগভাবে এবং সাংবিধানিকভাবে যেতে হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এখন যদি বলা হয় যে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে, মানলাম। আমরা নির্বাচিত হয়েছি সাংবিধানিক ভোটে। নির্বাচন কমিশনের দুইটাই এখতিয়ার। একটা হচ্ছে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, আরেকটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এটা হচ্ছে কনস্টিটিউশনাল ম্যান্ডেট, যেটা নির্বাচন কমিশন পালন করতে বাধ্য।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের জন্য আরেকটা আইন হয়েছে। বিএনপিও এটা প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু মাঝখানে আদেশটা জারি করে গণভোট দেওয়া হলো চারটা প্রশ্ন। যে প্রশ্নের মধ্যে একটা বিশাল প্রশ্ন জুলাই জাতীয় সনদের সমঝোতা হয়নি। এটা একটা জবরদস্তিমূলক আরোপিত আদেশ করে সেই আদেশের একটা প্রশ্ন গণভোটের মধ্যে দেওয়া হয়। চারটা প্রশ্ন হলেও মানুষ কোন কোন প্রশ্নে হ্যাঁ, কোন কোন প্রশ্নে না বলবে সে বিকল্প ছিল না।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারপরও গণভোটের রায় যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, সংবিধানে আগে সংস্কার আসতে হবে। তিনি বলেন, এই অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল আনা যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ, ১৩৩টা অধ্যাদেশ এখানে উত্থাপিত হয়েছে প্রথম দিনে। তিনি বলেন, কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে যদি সিদ্ধান্ত হয়, সংসদ যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বাজেট অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন হতে পারে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি কোনো কিছু অস্বীকার করছি না। জনরায়কে সম্মান দিতে হবে, কিন্তু সেটা সাংবিধানিকভাবে দিতে হবে, আইনগতভাবে দিতে হবে। এখানে ইমোশনের কোনো জায়গা নেই। রাষ্ট্র ইমোশন দিয়ে চলে না। রাষ্ট্র চলে সংবিধান দিয়ে, আইন দিয়ে, কানুন দিয়ে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনা করার প্রস্তাব দেন বিরোধীদলীয় নেতাকে।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, তাঁরা জাতির কাছে অঙ্গীকার করেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে তার প্রতিটি শব্দকে তাঁরা সম্মান করেন। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে আরোপিত কোনো আদেশ দিয়ে, কোনো অবৈধ আদেশ দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা যায় কি না, সেটা একটা বিশাল আইনি প্রশ্ন, সাংবিধানিক প্রশ্ন। তিনি সেটা নিয়েও বিতর্ক ও আলোচনার আহ্বান জানান।

বিরোধী দলের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন রাষ্ট্রপতির আলোচনায় বলেন, আমরা সকলেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলছি। যে সনদের ব্যাপারে আমরা সকল দল একমত হয়ে স্বাক্ষর করেছি, যে সংস্কারের বিষয়ে প্রায় ৭০ পার্সেন্ট জনগণ 'হ্যাঁ' ভোট দিয়েছে। কিন্তু আজকে সেই সনদ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে সেটা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বাস্তবায়ন সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ নিয়ে আজকেও এই সংসদে কথা হয়েছে। সংসদ সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন সাহেব বললেনÑ এই আদেশটি না আইন, না অধ্যাদেশ। হ্যাঁ, এটি অধ্যাদেশ না। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনটা অধ্যাদেশ এটা নির্ধারিত হয়েছে। কিন্তু এটা আইন মাননীয় স্পিকার, এবং আইনের যে সংজ্ঞাটা এটা আমাদেরকে সংবিধান থেকেই নিতে হবে। বাইর থেকে নিলে চলবে না।

তিনি বলেন, আইন কী এ ব্যাপারে সংবিধানে স্পষ্টভাবে ১৫২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সেটা আমি পড়ছিÑ আইন অর্থ কোনো আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ। সুতরাং সকল আদেশ, যে আদেশগুলা রাষ্ট্রপতি দিয়ে থাকেন সেগুলা আইন এই সংবিধান অনুযায়ী। আমাদের এই বাংলাদেশে এই আদেশ কিন্তু প্রথম আদেশ নয় মাননীয় স্পিকার। এই আদেশ কিন্তু আগেও হয়েছে। আমাদের দেশে ১৯৭২ সালে, ৭১ ও ৭২ সালে ১৫৫টির বেশি আদেশ হয়েছিল যেগুলা এখনো আইন হিসেবে বলবৎ রয়েছে। আমরা যে এখানে নির্বাচিত হয়েছি মাননীয় স্পিকার, সেই নির্বাচনটা হয়েছে আরপিও-র আন্ডারে। সেই আরপিও-টা কী? রিপ্রেজেন্টেশন অফ পিপলস অর্ডার ১৯৭২, এটি একটি রাষ্ট্রপতির আদেশ। সুতরাং এটা বলার কোনো সুযোগ নেই যে রাষ্ট্রপতির আদেশ এটা আইন নয়। আমরা এই সংবিধান সংরক্ষণের জন্য, সমুন্নত রাখার জন্য শপথ নিয়েছি। এই সংবিধান অনুযায়ী যেটা আইন সেটা আমাদের মানতে হবে। রাষ্ট্রপতির আদেশ একটি আইন এটা আমাদের মানতে হবে। এই আইনের ব্যত্যয় যারা ঘটিয়েছেন তারা আইন ভঙ্গ করেছেন। আজকে আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে এই সংবিধান সংস্কার পরিষদ ডাকার কথা ছিল।

তিনি আরো বলেন, এখানে অনেক কথাই বলা হয়েছে আজ। বলা হয়েছে আমরা এই জুলাইয়ের সনদকে সম্মান করি, গণরায়কে সম্মান করি। কিন্তু আবার বলা হয়েছে আমাদের সময় নেই এটা বাস্তবায়ন করার জন্য। আসলে আমরা যদি সম্মান করি, তাহলে সময় কেন থাকবে না? আমাদেরকে সময় বের করতে হবে, জুলাইয়ের সনদ আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে। এই সংসদে আমরা সংবিধান সংশোধন করে আমরা এটা বাস্তবায়ন করতে পারব না। আমাদের সুপ্রতিষ্ঠিত যে জুরিসপ্রুডেন্স রয়েছে, সেই অষ্টম সংশোধনীর আনোয়ার হোসেনের মামলায় যেটা বলা হয়েছেÑ সংসদ চাইলেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে পরিবর্তন করতে পারেন না। অষ্টম সংশোধনীর স্পেসিফিক যে বিষয়টি ছিল সেটি ছিল এই বিচার বিভাগকে বিকেন্দ্রীকরণ। সেই বিষয়টি কিন্তু আমাদের সেই অধ্যাদেশের মধ্যেও এসেছে, আমরা গণভোট সেই বিষয়ে দিয়েছি জুলাই সনদের মধ্যেও রয়েছে। সেখানে আমরা যদি আবার একই বিষয়কে সংসদে সংশোধন করি, সেই আনোয়ার চৌধুরীর অষ্টম সংশোধনী মামলার রায় কোথায় যাবে?

পরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের উদ্দেশে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আপনি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উপস্থাপন করেছেন। এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন দ্য স্পট সলিউশন দেওয়া যায় না। এটার জন্য আপনি নোটিশ দেবেন। নোটিশ পাওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত দেব।’

পরে বাইরে বের হয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে সৃষ্ট সংকটের সমাধান জাতীয় সংসদের ভেতরে হোক, এমনটা চায় বিরোধী দল। তবে সংসদের ভেতরে এর সমাধান না হলে রাজপথে নামবো।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সরকার গঠনের পর সংসদ অধিবেশন ডাকা হলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা হয়নি। অধিবেশনের প্রথম দিন সময় কম ছিল, বিরোধী দলও একটা ইস্যুতে ওয়াকআউট করেছিল। বিরোধী দল সেখানে কথা তুলেছিল, কিন্তু তাদের কথা আমলে নেওয়া হয়নি। অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনের শুরুতে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধী দল সে ব্যাপারে কথা বলার চেষ্টা করেছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ পুরোটাই সংসদে পড়ে শোনানো হয়েছে উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, শেষ পঞ্জিকা দিবস উপলক্ষে বিরোধী দল রোববারের মধ্যে এর সমাধান চেয়েছে। বিরোধী দল যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছে, এই শপথের কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, পাশাপাশি যাঁরা শপথ নেননি, তাঁরা কবে শপথ নেবেন, সেটি জানতে চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সংস্কার পরিষদের অধিবেশন কবে ডাকা হবে, গণভোটকে আদৌ মান্য করা হবে কি নাÑএসব প্রশ্নও তোলা হয়েছে।

শফিকুর রহমান বলেন, পয়েন্ট অব অর্ডারে এসব বিষয় তুলে ধরা হলে স্পিকার বলেছেন, এই ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নোটিশ দিলে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা করা হবে। বিরোধী দল একটি নোটিশ দিয়ে সংসদের ভেতরেই এই সমস্যার সমাধান চাইবে। কিন্তু সংসদের ভেতরে যদি জনগণের প্রত্যাশা বা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন না ঘটে, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাজপথে নামতে হবে। তবে বিরোধী দল সেটা চায় না।

বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, ‘আজকে যেহেতু আমরা বিষয়টা উত্থাপন করেছি, মাননীয় স্পিকার যেহেতু এটা বিবেচনায় নিয়েছেন, নোটিশ দিতে বলেছেন, সেই ধারাবাহিকতায় এটা এখন চলতে পারে।’

এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন বলেন, ‘আচ্ছা দেখেন, সংবিধানে কি ২০২৬ সালে কোনো ভোট ছিল ? এটা তো ছিল না। এই প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডার, একই অর্ডার, এই একই অর্ডারের মাধ্যমে যেটা হয়েছে, আপনি এক অংশকে সংবিধানের বাইরে গেলেও মানবেন, আরেক অংশকে বাইরে গেলে মানবেন না। না মানলে দুটোই না মানেন। আর মানলে তো দুটোই মানতে হবে।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, একটা কথা আছে যে পাবলিকস ওপিনিয়ন বা উইল হইলো সুপ্রিম কনস্টিটিউশন। তো সেখানে গণভোটে আপনি রায় নিয়েছেন। গণভোটে তো উনারাও সম্মত, আমরাও সম্মত। আমাদের দাবি ছিল গণভোটটা আগে হোক। আর উনাদের দাবি ছিল একই দিনে হোক। উনাদের দাবিই বাস্তবায়ন হয়েছে।

বিএনপি একসময় গণভোটের প্রচার চালিয়েছে, এখন অবজ্ঞা করছে: নাহিদ

গতকাল রোববার সংসদের অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, ‘বিএনপি একসময় গণভোটের পক্ষে প্রচার চালালেও এখন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেটিকে অবজ্ঞা করার চেষ্টা করছে।’

নাহিদ বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানই বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়া, অর্ন্তর্বতী সরকার এবং এই নির্বাচনের মূল ভিত্তি ও বৈধতা। সব বিষয় শুধু সংবিধানের ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিরোধীদলীয় এমপি বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাই কমিশনের কোনো কার্যক্রমকে এখন অসাংবিধানিক বলার সুযোগ নেই। জনগণের রায় সংস্কারের পক্ষে আসার পরও সংসদ সেটিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ বলেন, গণভোট কোনো নতুন বিষয় নয়; অতীতেও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে এ ধরনের বিষয় মীমাংসা হয়েছে। বিএনপির অনেক সংসদ সদস্য এবং দলীয় প্রধানও একসময় গণভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। কিš‘ এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেটিকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।

ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর তিন দলীয় জোটের রূপরেখা ভঙ্গ করায় তৎকালীন সরকারকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে দেশে আবারও ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

অধিবেশন শেষে এনসিপির আরেক সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দেশের রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল। সে সময় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনর”দ্ধারের জন্য জর”রি ভিত্তিতে নানা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।

গণভোট নিয়ে সংসদের বর্তমান অবস্থানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি যে গণভোটের আদেশ দিয়েছেন, সেটিকে এখন অসাংবিধানিক বলা হ”েছ। অথচ একই প্রক্রিয়ায় হওয়া সংসদীয় নির্বাচনকে সাংবিধানিক বলা হ”েছ। এটি একটি দ্বিমুখী অবস্থান।

তিনি বলেন, অর্ধেক মানলাম আর অর্ধেক মানলাম নাÑএ ধরনের ডুয়েল অবস্থান স্পষ্ট নয়। সামগ্রিক পরিস্থি’তি বিবেচনা করে দলীয়ভাবে আলোচনা শেষে এনসিপি তাদের পরবর্তী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।