আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে দেশজুড়ে দুই পর্বে ৭ দিনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৭ লাখের বেশি সদস্য এবার ভোটের নিরাপত্তায় মোতায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা থেকে শুরু করে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স পরিচালনা, সবকিছুর সমন্বয় থাকবে রিটার্নিং কর্মকর্তার অধীন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল বুধবার এ-সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে। তফসিল ঘোষণার আগে দুই দফা এবং তফসিলের পর বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে ইসি। এরপরই আইন শৃঙ্খলা বিষয়ক এ পরিপত্র জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও ৮ দিনের জন্য মাঠে নেমেছিল সশস্ত্র বাহিনী। তবে যাতায়াতের জন্য আরো পাঁচ দিন সময় নিয়েছিল। একাদশ সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে ছিল ১০ দিন।

পরিপত্রে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে শাশিÍশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও ভিডিপি, কোস্টগার্ড নিয়োগ করা এবং স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দিতে ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার-এর আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পরিপত্রে বলা হয়েছে, দুই পর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন থাকবে। প্রথম পর্বে চলমান যাঁরা মোতায়েন রয়েছেন, তাঁরা বলবৎ থাকবেন। দ্বিতীয় পর্বে ভোটকেন্দ্রিক মোতায়েন, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৭ দিন দায়িত্ব পালন করবেন। পরিপত্র অনুযায়ী ভোটের চার দিন আগে, ভোটের দিন ও ভোটের পরে দুদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত থাকবে।

এর আগে, গত ২০ অক্টোবর সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে আট দিন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব দিয়েছিল নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি বৈঠকে। ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রস্তুতি বৈঠকের পর নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ ওইদিন বলেন, ইসির এবার ভোটে ৫ দিন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী রাখার পরিকল্পনা ছিল। আজ বৈঠকে ৮ দিন রাখার প্রস্তাব এসেছে। এটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হবে। সচিব জানান, ইসির পরিকল্পনা ছিল, ভোটের আগে তিন দিন, ভোটের দিন এবং ভোটের পরে তিন দিন মাঠে থাকবেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

পরিপত্রে বলা হয়, নির্বাচনী এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, র‌্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও আনসার ব্যাটালিয়ন মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে। বিজিবি, র‌্যাব, এপিবিএন ও আনসার ব্যাটালিয়ন জেলা-উপজেলা ও থানাভিত্তিক কাজ করবে। কোস্টগার্ড দায়িত্বে থাকবে উপকূলীয় এলাকায়।

সব বাহিনী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে রিপোর্ট করবে এবং তাঁর নির্দেশ ও পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবে। প্রয়োজনে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং টিম পুনর্বিন্যাস করা যাবে।

আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল থাকবে

আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল গঠন করার কথা জানিয়ে পরিপত্রে বলা হয়, পুলিশ, আনসার ভিডিপির পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড এবং র‌্যাবের সমন্বয় স্থাপন করতে হবে। এ সমন্বয় সেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন।

পরিপত্রে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সার্বক্ষণিক সেবা প্রদানের জন্য জরুরি পরিষেবা নম্বর ৯৯৯-এ বিশেষ টিম গঠন করে আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। ওই টিম নির্বাচনসংক্রান্তু প্রাপ্ত অভিযোগ/তথ্যের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এলাকাভিত্তিক আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলে পাঠাবে।

জেলা ও উপজেলায় পর্যায়ে স্থাপিত আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা সংবেদনশীলতা বিবেচনায় পুলিশ ও আনসার ভিডিপির পাশাপাশি কেন্দ্রগুলোতে সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও র‌্যাব মোতায়েন করা হবে।

এ ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য নির্বাচনকালীন জেলা ও উপজেলায় গঠিত আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলের সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার, বিশেষ তথ্যের ভিত্তিতে এলাকাভিত্তিক অভিযান এবং চেক পয়েন্ট (তল্লাশিচৌকি) অভিযান পরিচালনা করবে।

ভোটের নিরাপত্তায় কত সদস্য

এবারের নির্বাচনে ভোটার রয়েছেন পৌনে ১৩ কোটি। ৩০০ আসনে প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে দুই লাখ ৬০ হাজারের মত ভোটকক্ষ থাকবে। প্রাথমিক সভায় প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৩ থেকে ১৮ জন সদস্য রাখার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭ লাখের বেশি সদস্য এবার ভোটের নিরাপত্তায় দায়িত্বে পালন করবেন। ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে আনসার-ভিডিপি সদস্যদের সংখ্যাই হবে সাড়ে ৫ লাখের মত। সশস্ত্রবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৯০ হাজারের বেশি। এছাড়া পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড থাকবে।

গত ১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভোটের তফসিল ঘোষণা করেন। পরদিন সম্ভাব্য একজন প্রার্থী গুলিবিদ্ধ হন। এরপর দুটো নির্বাচনি অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সার্বিক পরিস্থিতিতে সিইসি, ইসি, সচিবসহ রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিস, নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়।

১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বৈধ অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ

আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বৈধ অস্ত্র বহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জারি করা এ সংক্রান্ত পরিপত্র থেকে বিষয়টি জানা যায়। এতে বলা হয়েছে, ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখ পর্যন্ত অস্ত্রের লাইসেন্সধারীগণ যাতে অস্ত্র বহন ও প্রদর্শন না করেন সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করা হবে। রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগ নীতিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে বৈধভাবে মনোনয়নপত্র দাখিল ও গৃহীত জাতীয় সংসদ সদস্য প্রার্থীর সশস্ত্র রিটেইনারের ক্ষেত্রে বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে না।