- পাকিস্তানী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানী প্রতিনিধি দলের বৈঠক
- যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভাবমর্যাদা বদলে দিয়েছে
- ইরানের জব্দ করা সম্পদ কি ছাড় করবে যুক্তরাষ্ট্র
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গতকাল শনিবার ঐতিহাসিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বার্তা সংস্থা আল-জাজিরা জানায়, প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল দুই দেশ পাক্তিানের মাধ্যমে কথা বলবে। কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর তারা সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই আলোচনায় মিলিত হন। পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় এটাকে ত্রিপক্ষীয় শাস্তি আলোচনা বলে অখ্যায়িত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈঠক
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এবার আর কোনো মাধ্যমের মাধ্যমে নয়, মার্কিনি ও ইরানিরা সরাসরি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, তাদের সূত্র জানিয়েছেন, প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল দুই দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে কথা বলবে। কিন্তু তারা একে অপরের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছেন। তবে যেখানে আলোচনা হয়, সেখানে পাকিস্তানি কর্মকর্তারাও উপস্থিত আছেন।
এ আলোচনায় মার্কিনিদের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স। অপরদিকে ইরানকে নেতৃত্ব দেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের ঘালিবাফ।
এদিকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায় দখলদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এরপর টানা ৪০ দিন তাদের মধ্যে যুদ্ধ হয়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ থামলেও; এ যুদ্ধবিরতি প্রথম থেকেই বেশ ভঙ্গুর। ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, যদি আলোচনা ব্যর্থ হয় তাহলে ইরানে আবারও হামলা শুরু হবে। এরজন্য জাহাজকে অস্ত্রেসজ্জিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, তিন পক্ষ মুখোমুখি আলোচনায় বসে।
তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের নেতৃত্বে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকোফ এবং জার্ড ক্রুসনার ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের ঘালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে দেখা করেন। ওই সময় সেখানে পাকিস্তানে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনিরও উপস্থিত ছিলেন।
পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জেডি ভ্যন্সের বৈঠক
ইরান-মার্কিন আলোচনায় যোগ দিতে ইসলামাবাদে পৌঁছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। গতকাল শনিবার পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শান্তি আলোচনা শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বৈঠক করেছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ছিলেন। এ সময় পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন রাজা নকভি। শাহবাজ শরিফ আলোচনা ফলপ্রসূ হবে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলও শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজের সঙ্গে বৈঠক করল ইরানি প্রতিনিধিদল
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেছে ইরানের প্রতিনিধিদল। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে এ প্রতিনিধিদলে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও উপস্থিত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনার উদ্দেশ্যে ইরানি প্রতিনিধিদল এখন ইসলামাবাদে অবস্থান করছে। গতকাল শনিবার তারা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ওই বৈঠকে অংশ নেন। তবে বৈঠকের বিস্তারিত সম্পর্কে এখনো কিছু জানানো হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুরু হতে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার আগে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা এবং দ্বিপাক্ষিক নানা বিষয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
বৈশ্বিক মনোভাব নাটকীয়ভাবে উল্টে দিল পাকিস্তান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা বিশ্বমঞ্চে দেশটির ভাবমর্যাদা নাটকীয়ভাবে বদলে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর পাকিস্তানের প্রতি বিশ্ববাসীর দীর্ঘদিনের নেতিবাচক ধারণা এখন ইতিবাচক মনোভাবে রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ইপসোসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত মাসের শেষ দিকেও পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিশ্বে ৯০ শতাংশ মানুষের নেতিবাচক ধারণা ছিল। তবে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ এখন পাকিস্তানের বিষয়ে ইতিবাচক মত দিচ্ছেন। ইপসোসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আগে পাকিস্তানের প্রতি বিশ্বের নেতিবাচক মনোভাবের পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। সমালোচকদের মতে, দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, আফগানিস্তানের সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব এর প্রধান কারণ। বিশেষ করে, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির নিরপেক্ষতা বজায় রাখা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন ছিল।
এমনকি ভারতের অনেক নাগরিকও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে পাকিস্তানের এ কূটনৈতিক সাফল্যের প্রশংসা করছেন। পাকিস্তানের প্রতি এমন নেতিবাচক মনোভাব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও খোদ পাকিস্তানের ভেতরেই সবচেয়ে বেশি ছিল। দেশটির অনেক নাগরিক সরকারের বৈধতা ও রণকৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ‘থ্যাংক ইউ পাকিস্তান’ হ্যাশট্যাগটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল এ যুদ্ধবিরতির জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের সমন্বিত উদ্যোগের প্রশংসা করছে। বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এ যুদ্ধবিরতির ফলে হরমুজ প্রণালি আবারও খুলে যাবে এবং এর মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের অবসান ঘটবে। ১৪ দিনের এ সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলাকালীন এখন সবার নজর ইসলামাবাদের দিকে। এমনকি ভারতের অনেক নাগরিকও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে পাকিস্তানের এ কূটনৈতিক সাফল্যের প্রশংসা করছেন।
বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এ যুদ্ধবিরতির ফলে হরমুজ প্রণালি আবারও খুলে যাবে এবং এর মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের অবসান ঘটবে। ১৪ দিনের এ সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলাকালীন এখন সবার নজর ইসলামাবাদের দিকে। সেখানে স্থায়ী চুক্তির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতে চলেছে। ইপসোসের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান বিশ্বমঞ্চে নিজের ভাবমূর্তি আমূল বদলে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। দেশটি এখন ‘একঘরে’ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি কাটিয়ে বিশ্বমঞ্চে একটি ‘প্রধান মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ইরানের জব্দ করা সম্পদ কি ছাড় করবে যুক্তরাষ্ট্র
কাতার এবং অন্যান্য বিদেশি ব্যাংকে জব্দ ইরানের সম্পদ ছাড় করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে— বার্তা সংস্থা রয়টার্স ইরানের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে এ কথা জানিয়েছিল। তবে বিষয়টি নজরে আসার পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের দপ্তর হোয়াইট হাউস বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
এর আগে ইরানের জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে ওই সম্পদ ছাড়ের কথা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে পাকিস্তানে তেহরান–ওয়াশিংটনের মধ্যে বৈঠকে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছে—এটা তারই ইঙ্গিত। তিনি বলেন, ইরানের সম্পদ ছাড়ের বিষয়টি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।
উল্লেখ্য, আলোচনার আগে তেহরানের পক্ষ থেকে দেওয়া ১০ দফার মধ্যে ইরানের সম্পদ ছাড়ের বিষয়টিও যুক্ত ছিল।
ওয়াশিংটন ঠিক কোন সম্পদ ছাড় দিতে রাজি হয়েছে, রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে তা উল্লেখ করেননি ইরানের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তবে দ্বিতীয় একটি ইরানি সূত্র বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র কাতারে আটকে রাখা ইরানের তহবিলের মধ্যে ৬০০ কোটি ডলার ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে। এ বিষয়ে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পায়নি রয়টার্স।
এদিকে ইরানের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সম্পদ ছাড়ের খবর অস্বীকার করেছেন হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় বলে জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা। ইসলামাবাদে শুরু হওয়া সরাসরি আলোচনা প্রায় দুই ঘণ্টা চলার পর নৈশভোজের বিরতি দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।