পুলিশে চাকরির বয়স প্রায় বিশ বছর। দীর্ঘ এই কর্মজীবনে দলীয় পরিচয়ে শৃঙ্খলাপরিপন্থি কাজ করেছেন অসংখ্যবার। যার বেশির ভাগ গুরুতর অপরাধ। কিন্তু সাজা বলতে কিছুই হয়নি। কারণ কর্মজীবনের প্রায় পুরোটাই আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্যাসিবাদ কায়েমে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে গেছেন। ২০২৪ সালের ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরও ফ্যাসিবাদ কায়েমে ভূমিকা রয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তার। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় থাকার পরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় ভিকটিম পরিবারে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের আশীর্বাদে ক্ষমতাবান হওয়া এই কর্মকর্তারা জঘন্য অপরাধ, দুর্নীতি, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত থাকা সত্ত্বেও বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
বলা হচ্ছে পুলিশ পরিদর্শক মোঃ মানিকুল ইসলাম মানিক (বিপি নং-৭৮০৪০৯৯১৩৭) এর কথা। বর্তমানে বরিশাল রেঞ্জে সংযুক্ত। জানা গেছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নানান অপরাধে জড়িত সর্বোচ্চ সুবিধভোগীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তিনি। বিগত সরকারের আমলে ক্ষমতাসীনদের প্রত্যক্ষ আশীর্বাদে তিনি একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ থানায় দায়িত্ব পেয়েছেন এবং নিয়মিত অনৈতিক সুবিধা ভোগ করেছেন। সিলেট রেঞ্জের ওসমানীনগর, কানাইঘাট, ফেঞ্চুগঞ্জ, সিলেট সদর, হবিগঞ্জ সদর, মাধবপুর ও শায়েস্তাগঞ্জ থানায় দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগসাজশ এবং কোটি কোটি টাকার অবৈধ সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ উঠে নির্যাতন, মানবাধিকার লংঘনেরও। বিভাগীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে ১৩টি প্রসিডিং ড্র হলেও সর্বনিম্ন সাজা হয়েছে ‘তিরস্কার’। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৩ বার যেসব অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছেন, তাতে তার চাকরিই থাকার কথা নয়, সেখানে তাকে ইনস্পেকটর পদে পদোন্নতিও দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আইন অনুযায়ী বিভাগীয় শাস্তি বলবৎ থাকলে পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার কথা, কিন্তু মানিকুল ইসলামের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। তার বিরুদ্ধে ১৩টি শাস্তিমূলক বিভাগীয় নথি থাকা সত্ত্বেও ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তাকে পুলিশ পরিদর্শক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। যা অনেক পুলিশ কর্মকর্তাই “বেআইনি” ও “সরকারি প্রভাবের ফসল” বলে দাবি করেছেন। পদোন্নতির পর তিনি হবিগঞ্জ সদর থানার ওসি তদন্ত হিসেবে দায়িত্ব পান এবং পরে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় থাকার সময় ২০১৮ সালের বিতর্কিত “দিনের ভোট রাতে” নির্বাচনে সরাসরি সহায়তার পুরস্কার হিসেবে তাকে দেয়া হয় জেলা ডিবি পুলিশের ওসির দায়িত্ব। এরপর থেকে তার ক্ষমতা, দাপট ও বিতর্ক আর থেমে থাকেনি।
জানা যায়, ১৯ বছরের চাকরিজীবনে মানিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর ১৩টি অভিযোগ প্রমাণ পেয়েছেন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তার বিপরীতে সাজা প্রয়োগ একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ২০০৭ সালের ২৯ মে নারী ঘটিত বিষয়ে তাকে প্রথম তিরস্কার করা হয়। একইবছরের ২৬ নভেম্বর পুলিশ সুপারের নির্দেশ অমান্য ও দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে তাকে দ্বিতীয়বার তিরস্কার করা হয়। ২০০৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তৃতীয়বার তিরস্কার পান। মাধবপুর থানার মামলার (নং ১৬(৮) ২০০৮) আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলে গড়িমসির কারণে চতুর্থবার তিরস্কার করা হয়। ২০০৯ সালের ৯ জুলাই থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওয়ারেন্ট তামিল সন্তোষজনক না হওয়ায় পঞ্চমবারের মতো তিরস্কার করা হয়। একই বছরের ২৬ নভেম্বর ৪ মাসের গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলে ব্যর্থতার কারণে ষষ্ঠবার তিরস্কার পান। ২০১০ সালে সিলেটের ওসমানীনগর থানায় কর্মরত থাকাবস্থায় ৮ মার্চ অদক্ষতার কারণে ৭ম তিরস্কার করা হয়। একই থানায় থাকাবস্থায় ২০১০ সালের ২২ মার্চ অষ্টমবার তিরস্কার পান। সিলেট সদর থানায় ২০০৯ সালের ২ জানুয়ারি দায়ের করা ৪নং মামলাটি তদন্তের দয়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। ওই মামলাটি তদন্তে গাফিলতির প্রমাণ পান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এই অভিযোগে তার কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হয়। জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় নবম তিরস্কার করা হয় তাকে। ২০১২ সালের ৮ মার্চ সিলেট মডেল থানার একটি অভিযোগ (স্মারক নং ১৬৩৭) তদন্তের পর প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। প্রতিবেদনটি অনুসন্ধানের ভিত্তিতে জানা যায়, মানিকুল ইসলাম ফোর্সদের অসভ্য ভাষায় গালগাল করেন। এমন গুরুতর অভিযোগ প্রমাণের পরও তাকে ১০ নম্বর তিরস্কার করা হয়।
মানিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভয়াবহ গুরুদণ্ডের ৩টি অভিযোগ পাওয়া যায় সিরাজগঞ্জে। ২০১৪ সালের ১৩ জুলাই সিরাজগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত ৩৮নং মামলাটি তদন্ত করেন তিনি। এ সময় আসামীদের পক্ষ নিয়ে কাজ করার অভিযোগ ওঠে। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার গাফিলতির প্রমাণ পান। আসামীকে গ্রেফতার না করে চার্জশিট দাখিল করে ১১ বারের মতো তিরস্কার পান ২০১৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। ২০১৪ সালের ১ আগস্ট দায়ের করা ৩নং মামলার চার্জশিট দখিল করেছেন মূল আসামীদের বাদ দিয়ে। সংশ্লিষ্ট মামলাটির প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের জবানবন্দি অনুযায়ী সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ না করে মূল আসামীদের হত্যার দায় থেকে বাঁচাতে চার্জশিট দেওয়া হয়। এরপর বিশ্বাসভঙ্গের এমন গুরুতর অভিযোগ এনে ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর ১২ নম্বর তিরস্কার করা হয়। ১৩নং তিরস্কারটিও আসে সিরাজগঞ্জ সদর থানায় কর্মরত অবস্থায় ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। অথচ সর্বশেষ তিরস্কার পাওয়ার ৮ মাসের মাথায় ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর পদোন্নতি পেয়ে ইনস্পেকটর হয়েছেন এই মানিকুল ইসলাম।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার মানিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।