ঢাকাসহ আশেপাশের এলাকা আবারো কেঁপে উঠলো ভূমিকম্পে। রিখটার স্কেলে চার দশমিক এক মাত্রার হাল্কা ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদী। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টা ১৪ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে এ ভূমিকম্প হয়। সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা জানিয়েছেন, নরসিংদীর শিবপুর এই হাল্কা মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল। তিনি জানিয়েছেন, ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র থেকে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ছিল ৩৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। এর আগে, গত ২১শে নভেম্বর, শুক্রবার থেকে দেশে শুরু হয় নানা মাত্রার একাধিক ভূমিকম্প। ওইদিন পাঁচ দশমিক সাত মাত্রার এক ভূমিকম্পে ঢাকাসহ সারাদেশ কেঁপে উঠেছিল। এর তীব্র ঝাঁকুনিতে দেশজুড়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিলো এবং বিভিন্ন জায়গায় মারা গেছেন অন্তত ১০ জন। আবহাওয়া বিভাগ প্রথমে এটিকে পাঁচ দশমিক সাত মাত্রার উল্লেখ করলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক সংস্থা ইউএসজিএসকে উদ্ধৃত করে ভূমিকম্পটি পাঁচ দশমিক পাঁচ মাত্রার ছিলো বলে ওয়েবসাইটে উল্লেখ করে। পরদিন শনিবার সকালে আবারও যে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিলো তিন দশমিক তিন। যার উৎপত্তিস্থল নরসিংদী জেলারই পলাশ উপজেলা। ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় এক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
আবহাওয়া বিভাগ সেসময় জানিয়েছিলো, এর একটির উৎপত্তিস্থল নরসিংদী আর অন্যটির উৎপত্তিস্থল ঢাকার বাড্ডা। এর মধ্যে বাড্ডার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে সন্ধ্যা ছয়টা ছয় মিনিট চার সেকেন্ডে, যার মাত্রা ছিলো রিখটার স্কেলে তিন দশমিক সাত। আর এক সেকেন্ডের মধ্যেই আরেকটি ভূকম্পন অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল নরসিংদী। রিখটার স্কেলে এটির মাত্রা ছিলো চার দশমিক তিন। অর্থাৎ, গত ২৪শে নভেম্বরের মধ্যে মোট চারটি ভূমিকম্পের মধ্যে তিনটিরই উৎপত্তিস্থল ছিলো ঢাকার কাছেই নরসিংদী জেলার দুটি উপজেলা আর একটির উৎপত্তিস্থল খোদ রাজধানী ঢাকারই বাড্ডা এলাকা বলে সেসময় জানিয়েছিলো আবহাওয়া বিভাগ।
গত কিছুদিনে কয়েক দফায় ভূমিকম্প হওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে জরিপ চালিয়ে ২৪শে নভেম্বর ঢাকায় ৩০০টি ভবনকে 'ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে চিহ্নিত করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সংস্থাটি সেসময় জানিয়েছিলো, ওইসময় পর্যন্ত তারা প্রায় ৩০০টি ছোট-বড় ভবনকে ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এছাড়া একের পর এক ভূমিকম্পে জনমনেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। তবে, ভূতত্ত্ববিদ ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা অবশ্য ভূমিকম্প নিয়ে উৎকণ্ঠিত না হয়ে সচেতন হবার পরামর্শ দিয়েছেন। সরকারের ফায়ার বিভাগ ভূমিকম্প অনুভূত হলে কি কি করতে হবে সে সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি নির্দেশনাবলীও দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকটনিক প্লেটে বাংলাদেশের যে অবস্থান তাতে দুটো প্লেটের সংযোগস্থল রয়েছে, পশ্চিমে ইন্ডিয়ান প্লেট আর পূর্ব দিকে বার্মা প্লেট। আর বাংলাদেশের উত্তরদিকে আছে ইউরেশিয়ান প্লেট।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার সেসময় বলেছিলেন, ভারতীয় প্লেটটি ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বার্মা প্লেটের নিচে অর্থাৎ চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। আর এই তলিয়ে যাওয়ার কারণে একটা সাব-ডাকশান জোনের তৈরি হয়েছে। এই জোনের ব্যাপ্তি সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত। পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চল এর মধ্যে পড়েছে। এখানে বিভিন্ন সেগমেন্ট আছে। আমাদের এই সেগমেন্টে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার শক্তি জমা হয়ে আছে।
নরসিংদী সংবাদদাতা জানান, নরসিংদীতে আবারো মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা ১৪ মিনিটে নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় এ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির নিশ্চিত করেছেন। এ নিয়ে মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে নানা আতঙ্ক। হয়েছে ভীতির সঞ্চার।
আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১, উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর শিবপুরে। এটি মৃদু মাত্রার ভূকম্পন। তবে এতে ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর এখনো পাওয়া যায়নি। এর আগে গত ২১ ও ২২ এবং ২৭ নভেম্বর চারদফায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। যার উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী, পলাশ ও ঘোড়াশাল এলাকায়। ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্পে জেলার তিনটি উপজেলায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। বেশ কিছু সরকারী-বেসরকারী ও আবাসিক ভবনসহ শতাধিক ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। ভূমিকম্পের কারণে জেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পলাশ উপজেলায়।