ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, স্পিকারের কাছে নিবেদন থাকবে, কোনো ফ্যাসিস্ট বা তার দোসর যেন বক্তব্য দিয়ে সংসদকে কলুষিত করতে না পারে। গতকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের ওপর আনা শোক প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে নাহিদ এ কথা বলেন।

স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, আজকে সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের কারণেই আমরা এই মহান সংসদে বসতে পেরেছি। এখানে আমরা সকলেই ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের সৈনিক। আপনার প্রতি নিবেদন থাকবে, কোনো ফ্যাসিস্ট বা তার দোসর যেন আজকের এই মহান সংসদে বক্তব্য দিয়ে সংসদকে কলুষিত করতে না পারে। বিচার দাবি করে নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা জুলাই গণহত্যার বিচার চাই। শরীফ ওসমান হাদী হত্যা, গুম-খুন, বিগত সময়ের লুটপাট ও দুর্নীতির বিচার চাই।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা হলো একটি নতুন বন্দোবস্তÑগণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন, মানবিক, আধিপত্যবাদমুক্ত ও ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশ। সংবিধানে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্যদের শপথ নেওয়ারও দাবি জানান নাহিদ।

বক্তব্যের শুরুতে নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার মিছিল নিয়ে আমরা এই জাতীয় সংসদের প্রাঙ্গণে এসেছিলাম এবং সংসদকে ফ্যাসিস্টমুক্ত করেছিলাম। আজ হাজারো শহীদের রক্ত আর অসংখ্য আহত-পঙ্গু দেশপ্রেমিকের সর্বোচ্চ ত্যাগের ফসল হিসেবে আমরা এই সংসদে বসতে পেরেছি। শহীদদের রক্তের সঙ্গে আমরা কোনো বেঈমানি করব না। শোক প্রস্তাবে অংশ নিয়ে নাহিদ ইসলাম ৪৭-এর লড়াই, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বর, মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং বিগত সময়ের গুম-খুনের শিকার ব্যক্তিসহ ২৪-এর শহীদদের স্মরণ করেন। ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা শরীফ ওসমান হাদী, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শহীদ আবরার ফাহাদ এবং সীমান্তে নিহত ফেলানী খাতুনের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি।

জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ৪ বছরের শিশু আহাদ, ৬ বছরের শিশু রিয়া গোপসহ প্রায় দেড়শ শিশুর কথা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে উল্লেখ করেন নাহিদ। পুলিশের এপিসি থেকে ফেলে দেওয়া শহীদ ইয়ামিন, আশুলিয়ায় আগুনে পুড়িয়ে মারা কিশোর সজল এবং মায়ের কাছে চিঠি লিখে যুদ্ধে যাওয়া দশম শ্রেণির ছাত্র শহীদ আনাসের কথাও তার বক্তব্যে উঠে আসে।

আন্দোলনে ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, নারী, প্রবাসী এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই অভ্যুত্থানের ভ্যানগার্ড ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলো। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি, ছাত্র অধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থী ও বামপন্থী ছাত্রকর্মীরা সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছেন। একইসঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ তরুণ সমাজকে অনুপ্রাণিত করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শোক প্রস্তাবে ফেলানী, আবরার ও হাদির নাম

জাতীয় সংসদের শোকপ্রস্তাবে শহীদ ওসমান হাদি, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ এবং সীমান্তে নিহত ফেলানী খাতুনের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। গতকাল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এ আহ্বান জানান।

নাহিদ ইসলাম বলেন, এই তিনটি ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের মনে গভীর দাগ কেটেছে। তারা অন্যায়, বৈষম্য ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। দেশের বিভিন্ন সময়ে আলোচিত এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের স্মরণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই জাতীয় সংসদের শোকপ্রস্তাবে তাদের নাম যুক্ত করা হলে তা জাতির পক্ষ থেকে সম্মান প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশের ইতিহাসে যারা অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, তাদের স্মরণ করা রাষ্ট্র ও জাতির কর্তব্য। আবরার ফাহাদ ও ফেলানী খাতুনের মৃত্যুর ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে জনমনে আলোচিত এবং তা দেশের সার্বভৌমত্ব ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নকে সামনে এনেছে।

বিরোধীদলীয় এই নেতা বলেন, জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে গৃহীত শোকপ্রস্তাবে এমন ব্যক্তিদের স্মরণ করা হলে তা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস ও ন্যায়বিচারের সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেবে।

তিনি আরো বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং শোকপ্রস্তাবে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে জাতির পক্ষ থেকে যথাযথ সম্মান জানানো হবে।