পৌষের মাঝামাঝিতে শীতের দাপটে কাঁপছে সারা দেশ। ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। এ অবস্থায় দেশের কয়েকটি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর।

এদিকে রাজধানী ঢাকায় রোববার মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করেছে। তা আবার আগামী কয়েকদিন সারাদেশে তাপমাত্রা কমতে পারেÑ ফলে আরও বেশি শীত অনুভূত হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। এদিন সকালে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দেশের আরও তিন স্থানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। স্থানগুলো হলো নওগাঁর বদলগাছী, পাবনা ও রাজশাহী। সেই তুলনায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বেড়েছে।

এদিকে রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রা খানিকটা কমেছে। এদিন সকালে ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আগের দিন তা ছিল ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা বলেন, রাজধানীতে শীতের প্রকোপ খানিকটা বেড়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। দিনের তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেও রাতের তাপমাত্রা আবার কমে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, সাধারণত তাপমাত্রা নির্ভর করে কুয়াশার ওপর। এটি বেশি হলে তাপ কমে শীত অনুভূত হয়। আগামী কয়েকদিন সারাদেশে কুয়াশা বেশি পড়তে পারে। ফলে শীত বেশি অনুভূত হতে পারে।

হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় কর্মহীন হয়ে পড়ছেন দিনমজুরসহ নিম্ন আয়ের মানুষ। প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাবে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা। এদিকে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে হাসপাতালে। শয্যার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসা সেবায় চাপ বেড়েছে। বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও বয়স্করা।

আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুচ্ছিা জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা আগামী কয়েক দিনে আরও বিস্তৃত ও তীব্র হতে পারে।

গতকাল আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারাদেশে মাঝারী থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে, এবং কোথাও কোথাও তা দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে। পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, যশোর, কুচ্ছিা, কুমিল্লা, মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলাসমূহের ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে, এবং দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে সারাদেশে শীতের অনুভূতি অব্যাহত থাকতে পারে। অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।

উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে, এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তরপূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া এ মাসের দীর্ঘকালীন পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, জানুয়ারিতে দেশের ওপর দিয়ে অন্তত পাঁচটি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।

নামতে পারেনি বিমান

ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে না পেরে ছয়টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। ঘন কুয়াশায় রানওয়ে দৃশ্যমান না থাকায় নিরাপত্তাজনিত কারণে ফ্লাইটগুলো শাহজালাল বিমানবন্দরে নামতে ব্যর্থ হয়। পরে বিকল্প হিসেবে এগুলো সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমদ জানান, কুয়াশার কারণে ঢাকার ছয়টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সিলেটে অবতরণ করেছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও আজ ছিল। কুয়াশা কেটে যাওয়ার পর এসব ফ্লাইট ঢাকায় ফিরে গেছে। ঘন কুয়াশার কারণে রাজধানীর আকাশপথে বিমান চলাচল ব্যাহত হলেও সিলেটে ফ্লাইট অবতরণের মাধ্যমে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে বলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

সিলেট ব্যুরো: ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ না করতে পেরে সিলেটর ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে ৬টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট।

গতকাল রোববার সকালে ঘন কুয়াশায় রানওয়ে দৃশ্যমান না থাকায় নিরাপত্তাজনিত কারণে ফ্লাইটগুলোকে সিলেট বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

এসব তথ্য জানিয়ে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক হাফিজ আহমদ বলেন, ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকার ৬ টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট আজ সিলেটে অবতরণ করেছিলো। এছাড়া আমাদের নিজস্ব আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও আজ ছিলো। কুয়াশা কমার পর এগুলো ঢাকায় ফিরে গেছে।

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা : মৌললভীবাজারে গত কয়েকদিন থেকে জেঁকে বসেছে শীত। জেলার উপর দিয়ে বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। একদিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা কমেছে প্রায় ৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস। রোববার ৪ জানুয়ারি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস। শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক আনিসুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। এর আগের দিন শনিবার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিলো ১২ দশমিক ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। সেই সাথে জেলা জুড়ে বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। ভোর থেকে ঘন কুয়াশা, কনকনে ঠান্ডা বাতাস আর দুপুর অবধি সূর্যের দেখা না মিলায় শীতের তীব্রতা বেড়ে চলেছে। ফলে সকাল থেকে কাজে বের হওয়া সাধারণ মানুষের দূর্ভোগ বেড়ে চলেছে। ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকছে সড়ক মহাসড়ক থেকে চা বাগান ও পাহাড়ি জনপদ।

ধামরাই (ঢাকা) সংবাদদাতা : ধামরাইয়ে জেঁকে বসছে তীব্র শীত। উপজেলার ১৬ ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় সূর্যের কোন দেখা মিলেনি তীব্র শীতের কারনে নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্টের কোন সীমা নেই। এই শীত কে উপেক্ষা করে কৃষকরা কৃষি কাজে ব্যস্ত থাকলেও তাদের নেই পর্যাপ্ত শীতের পোশাক। শিশু ও বয়স্করা শীতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এই শীতে নিম্ন আয়ের মানুষের কাজকর্ম কম থাকায় খাদ্য কষ্টে ভুগছে অসহায় মানুষ গুলো।

চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা: চুয়াডাঙ্গায় টানা চারদিন পর আবহাওয়ার পূর্বাভাসে শৈত্যপ্রবাহ কেটে যাবার কথা বলা হলেও কমেনি শীতের তীব্রতা। উত্তরের হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশার দাপটে জনজীবনে চরম ভোগান্তি নেমে এসেছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে শিশু, বয়স্ক ও খেটে খাওয়া মানুষ। গতকাল রোববার ভোর থেকে সারাদিনই বৃষ্টির মতো কুয়াশার কারণে যানবাহন চলাচলেও ব্যাঘাত ঘটেছে। চুয়াডাঙ্গার আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিস জানায়, রোববার সকাল ৯টায় চুয়াডাঙ্গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৭ শতাংশ। এর আগে শনিবার ৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি, শুক্রবার ৯ ডিগ্রি, বৃহ¯পতিবার ৮ দশমিক ৭ ডিগ্রি এবং বুধবার জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত চারদিন ধরে মাঝারি থেকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেলেও তা এখন কেটে গেছে।

চুয়াডাঙ্গার প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানান, টানা চারদিন মাঝারি থেকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ আপাততঃ কেটে গেলেও চলতি সপ্তাহে আবার নতুন করে শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, আগামী মঙ্গলবার অথবা বুধবার থেকে পুনরায় জেলার ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। সে সময় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ থেকে সাড়ে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যেতে পারে।

এদিকে ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও বৃষ্টির মতো ঝরছে কুয়াশা। ঝুঁকি এড়াতে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে যানবাহন। শীতের তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষ ও ছিন্নমূলরা। অনেককে খোলা জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করতে দেখা গেছে।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনমজুর ও শ্রমিকরা জানান, শীত উপেক্ষা করেই কাজে যেতে হচ্ছে। এক কৃষি শ্রমিক বলেন, ভোরে মাঠে নামতেই খুব কষ্ট হচ্ছে। ঠান্ডায় হাত ঠিকমতো চলে না। বাতাস থাকায় শীত আরও বেশি লাগছে। তারপরও কাজ না করলে চলবে না।

শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব সাময়িকভাবে কমলেও ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ার কারণে চুয়াডাঙ্গার জনজীবনে শীতজনিত দুর্ভোগ এখনও অব্যাহত রয়েছে।

মাধবদী (নরসিংদী) সংবাদদাতা: তীব্র শীতের প্রকোপ বেড়েই চলেছে নরসিংদীর মাধবদীতে। ছিন্নমূল মানুষের আহাজারি কর্মহীন হয়ে বিপাকে পড়েছে অনেক শ্রমজীবী মানুষ। তীব্র শীতকে উপেক্ষা করে খেটে খাওয়া মানুষ গুলো কাজের উদ্দেশ্যে বেড় হলেও তারা স্বাভাবিক কাজ কর্ম করতে পাচ্ছে না। রিকশা, ভ্যানচালকরা পাচ্ছে না ভাড়া। এদিকে ঘন কুয়াশার কারণে সড়ক ও মহাসড়কে হেডলাইট জ্বালিয়ে যান বাহন চলাচল করতে দেখা গেছে। স্বাভাবিক জীবন যাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কর্মজীবী মানুষের কাজ না থাকায় তাদের দৈনন্দিন আয়ে টান পড়েছে। শীত নীবারণের জন্য অনেকই খড়কুটা শুকনো পাতা ও কাঠ জ্বালিয়ে তাপ নিচ্ছেন। মাধবদী শহরের বাইরে গ্রামাঞ্চলে এই দৃশ্য আরও প্রকোট, শীতজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে। শীতার্তদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা জরুরি হয়ে উঠেছে। তবে উচ্চ আর্দ্রতা, ঘন কুয়াশা ও হিমেল বাতাসের কারণে শীতের তীব্রতা অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে। কুয়াশায় বিপর্যস্ত দেশের মধ্যে অন্যতম শিল্পাঞ্চল মাধবদীতে জেঁকে বসেছে হাড়কাঁপানো শীত। ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন নরসিংদী জেলার শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকসহ নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ। টানা কয়েকদিন ধরে তাপমাত্রা কমতে থাকায় শীতের তীব্রতা যেন আরও বেড়েছে। ঘন কুয়াশার কারণে প্রকৃত শীত অনুভূত হচ্ছে আরও বেশি।