দাম কমে যাওয়ার সুফল পায় না গ্রাহক, বেড়ে গেলে দিতে হয় আরো চড়া মুল্য

ভোক্তা পর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম চলতি বছরের ১২ মাসের মধ্যে ডিসেম্বর ও ফেব্রুয়ারি মাসে দাম বেড়েছে। বাকী মার্চ, জুন, জুলাই, আগষ্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর মোট ৮ মাসে দাম কমেছে। দাম অপরিবর্তিত ছিল জানুয়ারি ও এপ্রিল মাসে।

সবশেষ গতকাল মঙ্গলবার এলপি গ্যাস কেজিতে বাড়ল ৩ টাকা ১৭ পয়সা। চলতি ডিসেম্বরে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ২৫৩ টাকা। গত মাসে দাম ছিল ১ হাজার ২১৫ টাকা; অর্থাৎ ডিসেম্বরে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৩৮ টাকা। গত মাসে কমেছিল ২৬ টাকা। এলপি গ্যাসের দাম বিগত দিনে কমলেও সাধারণ গ্রাহকরা এর সুফল না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে এ দাম ঘোষণা করেন বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। গতকাল সন্ধ্যা ছয়টা থেকে নতুন দর কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে। সংস্থাটি প্রতি মাসেই এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। তবে বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি না হওয়ার অভিযোগ আছে। এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে।

বিইআরসির নতুন দর অনুযায়ী, বেসরকারি এলপিজির মূল্য সংযোজন করসহ (মূসক/ভ্যাট) দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ১০৪ টাকা ৪১ পয়সা। গত মাসে তা ছিল ১০১ টাকা ২৪ পয়সা; অর্থাৎ এ মাসে দাম কেজিতে বেড়েছে ৩ টাকা ১৭ পয়সা। এই হিসাবে বিভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত হবে। বাজারে বিভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যায়।

সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা এলপিজির সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজির (অটো গ্যাস) দাম প্রতি লিটার ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মাসে তা ছিল ৫৫ টাকা ৫৮ পয়সা। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়।

প্রতি মাসে এলপিজির এই দুই উপাদানের মূল্য প্রকাশ করে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরামকো। এটি সৌদি কার্গো মূল্য (সিপি) নামে পরিচিত। এই সৌদি সিপিকে ভিত্তিমূল্য ধরে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। আমদানিকারক কোম্পানির চালান (ইনভয়েস) মূল্য থেকে গড় করে পুরো মাসের জন্য ডলারের দাম হিসাব করে বিইআরসি।

এর আগে গেলো বছর ২০২৪ সালে ৪ দফা কমেছিল এলপিজি ও অটোগ্যাসের দাম, আর বেড়েছে ৭ দফা। এক দফা ছিল অপরিবর্তিত। গত বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর বাড়ানো হয়েছিল এলপিজি ও অটোগ্যাসের দাম। আর দাম কমেছিল এপ্রিল, মে, জুন ও নভেম্বরে। তবে দাম অপরিবর্তিত ছিল ডিসেম্বরে।

বিইআরসির সূত্র জানায়, চলতি বছরের নভেম্বর মাসে এলপি গ্যাসের দাম ২৬ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ২১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি অটোগ্যাসের দাম ভোক্তাপর্যায়ে ১ টাকা ১৯ পয়সা কমিয়ে ৫৫ টাকা ৫৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। অক্টোবর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৯ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ২৪১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম কমেছে ৩ টাকা। আগস্ট মাসে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৯১ টাকা কমে ১ হাজার ২৭৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পাশাপাশি অটোগ্যাসের দাম ৪ টাকা ১৮ পয়সা কমে ৫৮ টাকা ২৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

গত ২ জুলাই ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩৯ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৩৬৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া ১ টাকা ৮৪ পয়সা কমিয়ে অটোগ্যাসের মূসকসহ দাম প্রতি লিটার ৬২ টাকা ৪৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর আগে, মে মাসের জন্য প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৯ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৪৩১ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া অটোগ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬৫ টাকা ৫৭ পয়সা। এপিল মাসে গ্যাসের দাম ছিল অপরিবর্তিত। মার্চ মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২৮ টাকা কমিয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছিল ১৯ টাকা। জানুয়ারি মাসে গ্যাসের দাম ছিল অপরিবর্তিত।

এদিকে প্রতি মাসেই রান্নার কাজে বহুল প্রচলিত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম নির্ধারণ করে দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু কয়েক মাস ধরে নির্ধারিত দাম থেকে ২০০-৩০০ টাকা বেশি দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটি কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। ফলে দাম কমলেও সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তারা। খুচরা বিক্রেতা কিংবা ডিলার নয়, খোদ আমদানিকারকরাই মানছেন না বিইআরসির ঘোষিত নির্ধারিত দর। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার কথা স্বীকারও করছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। অথচ আমদানি ও বিপণন খরচ, ডিলার খুচরা ব্যবসায়ীদের কমিশন সব কিছু বিবেচনায় নিয়েই দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। তারপরেও প্রকাশ্যেই বাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে রান্নায় ব্যবহৃত অতি জরুরি এই পণ্যটি।

এদিকে স্বস্তি নেই গ্রাহকের, বেশি দামেই কিনতে হচ্ছে এলপিজিবিষয়টি নিয়ে বাজারে তদারকিও নেই বিইআরসির। বরং বাজারে দাম বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসনের তদারকির ওপর দায় ছেড়ে দিয়েছে রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানটি।

সূত্র জানায়, দেশের বাজারে অন্তত ২৪টি এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পণ্যটি বাজারজাত করছে। তবে কোম্পানিগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি এড়িয়ে যাননি। তাদের দাবি, কোম্পানি ও পরিবেশক পর্যায়ে কমিশন নির্ধারিত দামেই পণ্যটি বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কমিশন নির্ধারিত দামের চেয়ে কম মূল্যে কোনো কোনো কোম্পানি বাজারে এলপিজি বিক্রি করছে।

রাজধানীর মিরপুর, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, কালশী, বনানী ও পুরান ঢাকার এলপিজির খুচরা বিক্রেতার দোকানে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন কোম্পানির এলপিজি সরকারের নির্ধারন করা দামের চাইতে বেশি দামে বিক্রি করছে।

জানা গেছে, এলপিজির ৯৫ শতাংশ সরবরাহকারী বেসরকারি অপারেটর। সরকারি প্রতিষ্ঠান রেগুলেটর হলেও মার্কেটে আধিপত্য মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর। তারাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে দাম ঘোষণা করে বসে থাকলেই চলবে না, দাম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কঠোর মনিটরিংয়ের বিকল্প নেই বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম জানান, এলপিজির ঘোষিত দাম বাজারে বাস্তবায়ন হয় না। গ্রাহকদের বেশি দামেই কিনতে হয়। দাম বাস্তবায়নে বিইআরসির উচিত ছিল ভোক্তা অধিদপ্তরের সঙ্গে একযোগে বাজার মনিটরিং করা। আগের মতো গতানুগতিক ধারায় চললে কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস কখনই তৈরি হবে না।

জ¦ালানী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এলপিজির ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বাজারে দাম বেশি এটা সত্য। তবে বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিং করা দরকার। বিষয়টি তদারক করার জন্য জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের আরো সক্রিয় হওয়ার দাবী তাদের।