পবিত্র মাহে রমযান আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছে। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে আসা এই মহিমান্বিত মাসের গতকাল ছিল চতুর্থ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ জুমার দিন। শেষ দশকের বরকত ও নাজাতের আশায় রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে নেমেছিল ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের উপচেপড়া ঢল। মসজিদের প্রতিটি ইঞ্চি ছাড়িয়ে জনসমুদ্র পড়েছিল আশপাশের সড়ক ও খোলা চত্বরে।

চতুর্থ জুমার জনসমুদ্র

শুক্রবার জোহরের আজানের অনেক আগে থেকেই বায়তুল মোকাররমের প্রতিটি গেট দিয়ে সাদা টুপি আর শুভ্র পাঞ্জাবি পরা মুসল্লিদের মিছিল শুরু হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যেই মসজিদের কয়েক তলা বিশিষ্ট মূল ভবন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে উত্তর ও দক্ষিণ গেট ছাড়িয়ে কাতার গিয়ে ঠেকে পল্টন মোড় ও বায়তুল মোকাররম মার্কেট চত্বর পর্যন্ত। যারা ভেতরে জায়গা পাননি, তারা রাস্তার ওপর জায়নামায ও প্লাস্টিকের চাদর পেতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়েন।

আবেগ ও বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি

জাতীয় মসজিদে নামায আদায়ের মাধ্যমে প্রশান্তি খুঁজে পান সাধারণ মানুষ। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজধানীর নাখালপাড়া থেকে নিজ সন্তানকে নিয়ে এসেছিলেন মাহবুবুর রহমান। তার চোখেমুখে ছিল প্রশান্তির ছাপ। তিনি বলেন, "নিজ এলাকার মসজিদে তো সারাবছরই নামায পড়া হয়। কিন্তু রমযান মাসের জুমাগুলো তো ঈমানি শক্তি সঞ্চয়ের বড় মাধ্যম। ছেলেকে সাথে নিয়ে এসেছি যেন সে শৈশব থেকেই ইসলামের এই বিশাল ভ্রাতৃত্ব ও ঐতিহ্য দেখে বড় হতে পারে। এতো মানুষ আর জাতীয় মসজিদের গাম্ভীর্য দেখে ও ভীষণ আনন্দিত।"

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা জামিল হোসেন গত কয়েক দশক ধরে এখানেই জুমা পড়েন। তিনি বলেন, "রোজার প্রতিটি জুমাই আমাদের জন্য রহমত। তবে চতুর্থ জুমায় এক ধরনের বিষণ্নতা কাজ করে কারণ রমযান বিদায় নিচ্ছে। সবার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামায পড়ার মধ্যে যে তৃপ্তি, তা আর কোথাও পাই না।"

খুতবা ও ঈমানি চেতনা

নামাযের আগে খতিব সাহেব পবিত্র রমযানের গুরুত্ব এবং বিশেষ করে শেষ দশকের 'লাইলাতুল কদর' তালাশ করার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি হালাল উপার্জন ও ইনসাফ কায়েমের ওপর জোর দেন। খুতবায় তিনি বলেন, রমযান আমাদের আত্মশুদ্ধির যে শিক্ষা দিয়ে যায়, তা যেন সারাবছর আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে প্রতিফলিত হয়।

মুসলিম উম্মাহর জন্য ক্রন্দন

নামায শেষে শুরু হয় দীর্ঘ ও আবেগঘন মুনাজাত। লাখো মানুষের 'আমীন, ছুম্মা আমীন' ধ্বনিতে বায়তুল মোকাররম ও আশপাশের এলাকা এক অপার্থিব পরিবেশে রূপ নেয়। মুনাজাতে নিজের গুনাহ খাতা থেকে মুক্তির পাশাপাশি দেশ ও জাতির সুখ-সমৃদ্ধি এবং শান্তি কামনা করা হয়। বিশেষ করে ফিলিস্তিনসহ সারা বিশ্বের নির্যাতিত মুসলিম উম্মাহর বিজয় এবং হেফাজত চেয়ে মহান আল্লাহর দরবারে মুসল্লিদের অশ্রুসিক্ত হতে দেখা যায়। হাজার হাজার মানুষের সমবেত রোনাজারিতে এক হৃদয়স্পর্শী আবহের সৃষ্টি হয়।