বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন নিয়োগ পাওয়া গভর্নরের জোরালো স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। টিআইবি নতুন গভর্নরের নিয়োগ বাতিলের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক নজরদারি সংস্থা হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। কাজেই এই নেতৃত্বের হাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ছেড়ে দেওয়াটা সামনের পাঁচ বছরের জন্য কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। নতুন সরকারের কাছে নিজেদের সুপারিশ তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে টিআইবি।
সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ এবং বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমের দেশে ফেরার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক। জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এর পেছনে যদি কোনো ষড়যন্ত্র থাকে, যেকোনো বিশেষ মহলকে সুযোগ করে দেওয়া, সেটি কিন্তু আরও বেশি গুরুতর প্রশ্ন। সেই ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, নিয়োগ উদ্যোগের মাধ্যমে যদি লুটপাটের অন্যতম দায়ী শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আবার কর্তৃত্বে ফিরিয়ে আনা হয়, সেটি কোনো অবস্থায় রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নিয়োগ বাতিল করে নতুন গভর্নরের নিয়োগের উদ্যোগ নিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রশাসনের বিভিন্ন পদে জোরপূর্বক রদবদল নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতি যদি সরকার প্রতিহত করতে না পারে, তবে এটি সরকারের জন্য আত্মঘাতী হবে। কারণ, সরকারের একটি ভুল পদক্ষেপ প্রতিপক্ষকে সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, সরকারের কিছু পদক্ষেপ মানুষের মধ্যে আশা সঞ্চার করেছে। পাশাপাশি কিছু দৃষ্টান্ত উদ্বেগজনক। একজন মন্ত্রী যখন চাঁদাবাজিকে বৈধ বলে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে যখন গভর্নর নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়, দুদকের চেয়ারম্যানসহ কমিশনারদের পদত্যাগ প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থা সৃষ্টি করে, তখন বোঝা যায় সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকিও অনেক।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কৌশলগত সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামত রূপরেখা, নির্বাচনি ইশতেহার এবং জুলাই সনদের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত কৌশল ও পথরেখা প্রণয়নের সুপারিশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার ও জুলাই সনদ অনুযায়ী নির্ধারিত সমন্বিত কৌশল ও পথরেখার ভিত্তিতে বাস্তবায়নযোগ্য সব কর্মপরিকল্পনার মূলধারায় সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী উপাদান সক্রিয় ও অবশ্যপালনীয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, দুর্নীতির কার্যকর ও দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ ছাড়া সরকারের অন্য কোনো অঙ্গীকার বা উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।
সুপারিশে আরও বলা হয়, দুর্নীতিবিরোধী নির্বাচনি অবস্থান ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের সুযোগ ও সক্ষমতার পাশাপাশি বহুমুখী প্রতিকূলতা ও ঝুঁকির উৎস, স্বরূপ ও প্রক্রিয়া চিহ্নিত করে তা মোকাবিলায় উপযুক্ত কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রণীত অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে কোনগুলো কোন যুক্তিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হবে বা হবে না, তা স্বচ্ছতার স্বার্থে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রকাশ করতে হবে।
সুপারিশে আরও বলা হয়, ক্ষমতাসীন দল বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থক, আমলাতন্ত্র এবং ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর মধ্যে দৃশ্যমান ‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির বিকাশ রোধে দল ও সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দল ও দলীয় অঙ্গসংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রে শুদ্ধতা চর্চা নিশ্চিত করতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নির্দেশনা জারি করতে হবে।
এছাড়া বিএনপির অভ্যন্তরে সরকারের সাফল্যের পরিপন্থি শক্তি যেন ক্রমান্বয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য সুচিন্তিত কৌশল গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে টিআইবি।
কর্তৃত্ববাদের পতন ও নির্বাচনে বড় বিজয়ের ফলে রাজনৈতিক বা সরকারি অবস্থান, জনপ্রতিনিধিত্ব বা অন্য কোনোভাবে ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাকে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির লাইসেন্স হিসেবে বিবেচনার প্রবণতা কঠোরভাবে প্রতিরোধ ও বিলুপ্ত করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।এ ছাড়া আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সব পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, দলবাজি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজিকে স্বাভাবিকতা দেওয়ার সব অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
পাশাপাশি সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনকে দলীয়করণের প্রভাবমুক্ত করতে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
নতুন সরকারপ্রধানের সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘোষণা এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান দেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক আশার সঞ্চার করেছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
সরকারের সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে টিআইবির পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ তুলে ধরতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন যে, বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে দৃঢ অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে, তা জনগণের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
টিআইবি প্রধান উল্লেখ করেন যে, নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক মনে হলেও কয়েকজন মন্ত্রীর সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যে জনমনে কিছুটা হতাশা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি মনে করেন, কেবল ঘোষণা দিলেই হবে না, বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর দৃশ্যমান বাস্তবায়ন জরুরি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান সরকার ও সকল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং পেশাজীবী সংগঠনকে সম্পূর্ণভাবে দলীয়করণের প্রভাবমুক্ত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখা না গেলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব নয় বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে টিআইবি বেশ কিছু সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করেছে। সংস্থাটি একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করার পাশাপাশি বিতর্কিত বাহিনী র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছে।
এ ছাড়াও ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, দলবাজি, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দখলবাজিকে স্বাভাবিক হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার যে অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়, তার বিরুদ্ধে সরকারকে অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। টিআইবি মনে করে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই অপসংস্কৃতি দূর করা সম্ভব এবং এর মাধ্যমেই প্রকৃত সুশাসন নিশ্চিত হবে।