# আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ ছাত্রশিবিরের
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলা এবং দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণের উদ্যোগে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেইটে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর, জাতীয় সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম বুলবুলের সভাপতিত্বে সমাবেশে হাজার-হাজার ছাত্র-জনতা ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান অংশ নেয়।
বিক্ষোভপূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংগঠনের নায়েবে আমীর ও সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ইরান একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। যারা ইসলামের উত্থান সহ্য করতে পারে না, তারা ইসরাইলকে ব্যবহার করে ইরানকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অতীতে ইরানের পার্লামেন্টে হামলা, অর্থনৈতিক অবরোধসহ নানা ষড়যন্ত্রের পরও দেশটির অগ্রযাত্রা থামানো যায়নি। তিনি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলে, তারা কীভাবে একটি স্বাধীন দেশে হামলা চালিয়ে নিরীহ মানুষকে হত্যা করে?
জাতিসংঘের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত জাতিসংঘ যদি প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর পক্ষাবলম্বন করে, তবে বিশ্ববাসীর মধ্যে এর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। তিনি জাতিসংঘ ও ওআইসিকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ইতিবাচক বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় বিভিন্ন স্থানে দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ তুলে তিনি দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ইরানে হামলার পেছনে কেবল ইসরাইল নয়, আরও শক্তিধর রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে বিশ্ববাসীর ধারণা। এ ধরনের ঘটনা বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা বাড়াতে পারে। তিনি ছোট-বড় সব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন সমানভাবে প্রযোজ্য করার আহ্বান জানান।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ। তিনি বলেন, ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের পর থেকে দেশটিকে ঘিরে নানা ষড়যন্ত্র চলছে। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক নিন্দা প্রস্তাব আনার দাবি জানান তিনি। কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, শক্তিধর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ছোট রাষ্ট্রের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা গ্রহণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি ইরানে সংঘটিত হামলা ও হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান এবং অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানান। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি।
সমাবেশে চুয়াডাঙ্গায় জামায়াত কর্মী হাফিজুর রহমান হত্যার প্রতিবাদ ও বিচার দাবি করেন বক্তারা। বক্তারা বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে ইফতারের পর বিএনপির সন্ত্রাসীরা জামায়াত কর্মী হাফিজুর রহমানকে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে এবং আরও কয়েকজনকে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। আমরা এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তারা হাফিজুর রহমানের হত্যার বিচারের জোর দাবি জানিয়ে বলেন, অবিলম্বে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেশে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সকল অন্যায় ও অপকর্মের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে এবং এর দায় সরকারকেই বহন করতে হবে।
সমাবেশ পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি ও ড. রেজাউল করিম। এ ছাড়া মহানগরীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও বহু কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশ শেষে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেইট থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি বিজয়নগর ও কাকরাইল হয়ে শান্তিনগর মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির শাহাদাত ও মার্কিন-ইসরায়েলি বর্বরোচিত যৌথ আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। গতকাল রোববার এক যৌথ বিবৃতিতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, “ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছিলেন বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদ ও জায়নবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় ও আপসহীন কণ্ঠস্বর। আজীবন তিনি মজলুমদের পক্ষে লড়াইয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষে তিনি ছিলেন এক সুদৃঢ় আশ্রয়। সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি তাঁকে হত্যার মাধ্যমে মূলত ন্যায়ের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে; কিন্তু তিনি নিজ মাতৃভূমি রক্ষায় লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করে প্রমাণ করেছেন যে, সত্যের সৈনিকরা কখনো মাথা নত করে না।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন, “গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যে প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে আসছিলেন, এই পরিকল্পিত আগ্রাসন তারই নগ্ন প্রতিফলন। গতকাল থেকে আকস্মিকভাবে ইরানজুড়ে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ, আইআরজিসি কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপোর এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলি শামখানিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনির পরিবারের সদস্যরাও নিহত হয়েছেন। বিশেষ করে, গতকাল দক্ষিণ ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলায় অন্তত ৮৫ জন নিরপরাধ শিশু শিক্ষার্থীর প্রাণহানি ঘটেছে। ঘটনাপরম্পরায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। সাম্রাজ্যবাদীদের এই নগ্ন হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো আজ সভ্যতা ও মানবতার জন্য প্রধান হুমকিতে পরিণত হয়েছে।”
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, “বর্তমান সময়ে আমেরিকা ও ইসরায়েল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যে আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসন চালাচ্ছে, তা বিশ্বশান্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ফিলিস্তিনের ওপর বছরের পর বছর জায়নবাদী নির্যাতন আর বর্তমান ইরানের ওপর এই নগ্ন আক্রমণ একই সূত্রে গাঁথা। আয়াতুল্লাহ খামেনি সব সময় এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন। তাঁকে শহীদ করার মাধ্যমে জায়নবাদীরা ভেবেছে মুসলিম উম্মাহর প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়া যাবে, কিন্তু এই রক্ত থেকে লক্ষ লক্ষ নতুন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর জন্ম নেবে। এই দানবীয় শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
নেতৃবৃন্দ বলেন, “শিশুসহ নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা বিশ্বকে এক অনিবার্য মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্বশান্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় অবিলম্বে এই আন্তঃরাষ্ট্রীয় যুদ্ধ বন্ধ করে কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানো ছাড়া আর কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। আমরা ইরানে চলমান নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও বেসামরিক জনগণের ওপর অব্যাহত হামলা বন্ধের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।” একই সঙ্গে এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে নেতৃবৃন্দ শহীদ খামেনিসহ সকল শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।