- হামলার পরও খারগ দ্বীপ থেকে তেল রফতানি অব্যাহত
- সৌদি আরবে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ৫ সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত
- মধ্যপ্রাচ্যে আরো যুদ্ধজাহাজ ও সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তড়িঘড়ি নেওয়া শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিকল্পনা এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখে পড়েছে। এতে যুদ্ধে মার্কিন শক্তি হ্রাসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে ইরানের খারগ দ্বীপে মার্কিন হামলার পরও দ্বীপটি থেকে তেল রফতানি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরানী হামলায় মার্কিন বিমানবাহিনীর ৫টি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ইরান যুদ্ধে অংশ নিতে উভচর যুদ্ধজাহাজ নিয়ে রওনা দিয়েছে ২৫০০ মার্কিন সেনা। ওমান থেকে জরুরি নয় এমন মার্কিন সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সে দেশ ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে। এপি, মিডল ইস্ট আই, আল জাজিরা, এএফপি, রয়টার্স, টি আরটি ওয়ার্ল্ড।
মার্কিন সামরিক শক্তি হ্রাসের আশঙ্কা
ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তড়িঘড়ি নেওয়া ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ পরিকল্পনা এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখে পড়েছে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক হস্তক্ষেপ। তবে যুদ্ধের শুরুতেই বিশৃঙ্খলা ও অদূরদর্শিতার চিত্র ফুটে ওঠায় কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা থেকে শুরু করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা অকেজো করা, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে। এর ফলে ওয়াশিংটন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ খবর জানিয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতেই পেন্টাগনের পুরনো তথ্য ব্যবহারের কারণে একটি মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র গিয়ে পড়ে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের ওপর। এতে ১৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র শত শত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলেও একটি ড্রোন কুয়েতের অস্থায়ী মার্কিন কমান্ড সেন্টারে আঘাত হানে। এতে ৬ মার্কিন সেনা নিহত এবং কয়েক ডজন আহত হয়েছেন।
যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক আটকা পড়েছেন। তাদের সরিয়ে নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তড়িঘড়ি করে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। সমালোচকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগে এসব নাগরিক ও দূতাবাস কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার কোনও যথাযথ পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না।
মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার বেশ কয়েকজন সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিহত হয়েছেন। তবে এর পরবর্তী ধাপ কী হবে, তা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে কোনও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। ট্রাম্প ইরানীদের উদ্দেশে কেবল বলেছেন, ‘আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা আপনাদের সরকারের দায়িত্ব বুঝে নিন।’ কিন্তু এই ক্ষমতা হস্তান্তর কীভাবে হবে, তার কোনও দিকনির্দেশনা নেই।
পেন্টাগনের দেওয়া তথ্যমতে, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে, যা তাদের পূর্ববর্তী নীতির সম্পূর্ণ উল্টো।
বারাক ওবামার সময়কার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ফিলিপ গর্ডন বলেন, এত অল্প পরিকল্পনায় এ ধরনের যুদ্ধ পরিচালনা করা কঠিন। ট্রাম্প কেন অবাক হচ্ছেন, তা ভেবে আমি অবাক হচ্ছি।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ মাইকেল রুবিন বলেন, সামরিক পরিকল্পনা হয়তো নিখুঁত, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি একটি চরম বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যেকোনও অভিযানের প্রথম ধাপ হলো একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা। পেন্টাগন নয়, এই অস্পষ্টতার দায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের।
সমালোচকরা বলছেন, ক্যারিয়ার কূটনীতিক ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ‘ডিপ স্টেট’ আখ্যা দিয়ে ছেঁটে ফেলার কারণেই এই সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ-এর সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাঘ সতর্ক করে বলেন, এই যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হবে ভয়াবহ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে নর্দমায় নিক্ষেপ করার শামিল, যার রেশ কয়েক দশক ধরে টানতে হবে।
যে শর্তে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের সুযোগ দিতে পারে ইরান
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের ক্ষেত্রে নতুন এক শর্ত আরোপের কথা ভাবছে ইরান।
সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে একজন জ্যেষ্ঠ ইরানী কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, যদি তেলের কার্গো বা লেনদেন চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এ সম্পন্ন করা হয়, তবেই নির্দিষ্ট সংখ্যক ট্যাংকারকে এই প্রণালি দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে তেহরান।
সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে ইরান এই কৌশলগত জলপথে ট্যাংকার চলাচল ব্যবস্থাপনার জন্য একটি নতুন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। মূলত বিশ্বজুড়ে তেলের বাজার মার্কিন ডলারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ইরান এই প্রথা ভাঙার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এর আগে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া রাশিয়ার তেল ক্রমেই রুবল বা ইউয়ানে বিক্রি শুরু হয়েছে। এবার ইরানও সেই পথ অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চীনা মুদ্রার প্রভাব বাড়ানোর বেইজিংয়ের প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করতে চাইছে।
মার্কিন হামলার পরও খারগ দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি অব্যাহত
ইরানের খারগ দ্বীপে মার্কিন হামলার পরও দ্বীপটি থেকে তেল রপ্তানি কার্যক্রম অব্যহত রয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান। ইরানের এক কর্মকর্তার বিবৃতির বরাত দিয়ে দেশটির বার্তা সংস্থগুলো এ কথা জানিয়েছে।
ইরানের সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা জানান, খারগ দ্বীপ থেকে রপ্তানি ‘সম্পূর্ণরূপে চলমান’ এবং দ্বীপে তেল কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বিনা বাধায় অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র খারগ দ্বীপে ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালানোর পর সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি অবরোধ অব্যাহত রাখে তবে দ্বীপটির গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলো মার্কিন হামলার পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
খারগ দ্বীপ থেকে ইরানের ৯০ শতাংশের বেশি তেল রপ্তানি হয়।
আরও এক দেশ ছাড়তে মার্কিন কূটনৈতিক কর্মীদের নির্দেশ ওয়াশিংটনের
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধির কারণে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ওমানে নিযুক্ত জরুরি নয়, এমন মার্কিন সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ওমান ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নতুন এক সতর্ক বার্তায় আমেরিকান নাগরিকদের ‘নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি’ সম্পর্কে সতর্ক করেছে।
সতর্ক বার্তায় বলা হয়েছে, ইরান থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি এখনো বিরাজ করছে এবং বাণিজ্যিক বিমান চলাচলেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে, যা যাত্রীদের জন্য নিরাপত্তা সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
গতকাল শুক্রবার ওমানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের প্রতিশোধমূলক আক্রমণ অব্যাহত থাকায় উত্তর ওমানে ড্রোন হামলায় দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছে।
সৌদি আরবে ইরানী হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ৫টি সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরানী হামলায় মার্কিন বিমানবাহিনীর পাঁচটি রিফুয়েলিং (জ্বালানি সরবরাহকারী) বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি সৌদি আরবের ওই ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় বিমানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে বিমানগুলো পুরোপুরি ধ্বংস না হওয়ায় বর্তমানে সেগুলো মেরামতের কাজ চলছে।
এই হামলায় কেউ নিহত হয়নি বলেও জানিয়েছে পত্রিকাটি।
উল্লেখ্য, এর আগে গত শুক্রবার ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে বিধ্বস্ত হয়েছে মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি কেসি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান। বিমানটিতে মোট ৬ জন ক্রু ছিলেন। তাদের মধ্যে চার জন নিহত হয়েছেন, বাকি দু’জনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
ইরানে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ৬ মাসের শিশুসহ একই পরিবারের নিহত ছয়
ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ইলাম প্রদেশের আইভান শহরে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ৬ মাস বয়সী এক শিশুসহ একই পরিবারের ছয় সদস্য নিহত হয়েছেন।
ইরানী গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।
স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি আবাসিক ভবনে ওই হামলা চালানো হয়। উদ্ধারকর্মীরা এখনো ঘটনাস্থলে রয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইরান যুদ্ধে অংশ নিতে ‘উভচর’ যুদ্ধজাহাজ নিয়ে রওনা দিয়েছে ২,৫০০ মার্কিন সেনা
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধে প্রথমবারের মতো ২৫০০ মার্কিন মেরিন সেনার একটি দল মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জাপানের ওকিনাওয়ায় অবস্থিত নিজেদের ঘাঁটি থেকে ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের সদস্যরা এখন যাত্রাপথে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছে উভচর যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’।
এ যুদ্ধজাহাজ থেকেই মেরিন সেনারা সরাসরি রণক্ষেত্রে নামবেন। কোনো সংকট মোকাবিলা কিংবা ইরানের কোনো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রয়োজনে তাদের ব্যবহার করা হতে পারে।
মূলত এ মেরিন সেনারাই হতে যাচ্ছেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের মধ্যকার যুদ্ধে মোতায়েন হওয়া প্রথম মার্কিন স্থলসেনা।
এর মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে ধীরে ধীরে তাদের সামরিক শক্তিবৃদ্ধি করছে এবং খুব দ্রুত এ যুদ্ধ শেষ করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।