ভোলায় সরকারের সমালোচনা করে ফেসবুক পোস্ট দেয়ায় জামায়াতের মহিলা বিভাগের কর্মী বিবি সাওদাকে গ্রেফতারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এটাকে সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুন্নিসা সিদ্দীকা। গত সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রতিবাদ বার্তায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, ভোলার বিবি সাওদা (৩৭) নামে জামায়াতে ইসলামী মহিলা বিভাগের কর্মী, যিনি ফেসবুকে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রীয় বিষয়ে মতামত প্রকাশ করেছিলেন। গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ রাতে ভোলা সদর মডেল থানার অধীনে অভিযান চালিয়ে জেলা গোয়েন্দা শাখার সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল তাঁকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। পরে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় তাকে বিজ্ঞ আদালতে চালান দেওয়া হয়েছে এবং জেল হাজতে আটক রাখার আদেশ চাওয়া হয়েছে। তাঁর “অপরাধ” — সরকারের নীতির সমালোচনা করা।

তিনি বলেন, একজন নারীকে রাতে বাড়ি থেকে আটক করা এটি কোনো আইনি প্রক্রিয়া নয়। সাইবার ক্রাইম সেলকে ব্যবহার করে ফেসবুক পোস্টের জন্য নাগরিকদের গ্রেফতার করা — গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত।

তিনি আরও বলেন, রাতের গভীরে গৃহ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া কোন সাধারণ ঘটনা হতে পারে না। চরমভাবে নারীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হয় অথচ নারীর গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুন্ন করা হয়েছে। এটা ভয়ের এক শাসনব্যবস্থার ইঙ্গিত। বিপ্লবোত্তর দেশে নারী গ্রেফতার করার মতো ঘটনা আমরা মেনে নেব না।

বিবৃতিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মহিলা বিভাগের পক্ষ থেকে এঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে বিবি সাওদার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি জানানো হয়। একই সাথে দেশের সকল নারীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের ব্যাপারে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার আহবান জানানো হয়।

একই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতি দিয়েছেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি আয়েশা সিদ্দিকা পারভীন।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের অধিকার নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই নাগরিকদের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা দেশে ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টারই বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে একজন নারীকে রাতের অন্ধকারে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া সমাজে আতঙ্ক ও অনিরাপত্তা সৃষ্টি করে। তিনি আরও বলেন, সরকার একদিকে নারীর ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণের কথা বললেও অন্যদিকে নারীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে।

শিবির সভাপতি

এঘটনা চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেছেন, ভোলা পৌরসভা মহিলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মী বিবি সাওদাকে গত ৫ এপ্রিল রাত ১১টার দিকে নিজ বাসা থেকে কোনো কারন ছাড়া গ্রেফতার করার ঘটনা চরম উদ্বেগের। বিনা উস্কানিতে পুলিশের এমন আচরণ মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এজন্যই তারা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল করে নব্য ফ্যাসিজমের দিকে দেশকে নিয়ে যেতে চায়।

শিশির মোহাম্মদ মনির

এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়ন আইনজীবী শিশির মোহাম্মদ মনির বলেন, ফেইসবুকে পোস্ট দেয়ার কারণে একজন নারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। এই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। উপরে যারা নির্দেশ দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন বাতিল করা হয়েছে। ফেইসবুকে পোস্ট দেয়া-সমালোচনা করা কোন অপরাধ নয়। সমালোচনা করতেই পারে। তিনি সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, অতি উৎসাহী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিন, দ্রুত এই বোনকে জামিনের ব্যবস্থা করুন এবং তার পরিবারের কাছে কৈফিয়ৎ দিন।

ডাকসু ভিপি

ভোলার জামায়াতকর্মী বিবি সাওদাকে গ্রেপ্তারের ঘটনা পুরনো ফ্যাসিবাদী নিপীড়নেরই অনুকরণ উল্লেখ করে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, তিন বছরের এক বাকপ্রতিবন্ধী শিশুর মাকে এভাবে বিনা অপরাধে নিজ বাসা থেকে মধ্যরাতে তুলে নেওয়া কেবল অমানবিক নয়, বরং ভিন্নমত দমনে নবগঠিত সরকারের সুপ্ত মনোবাসনারই বহিঃপ্রকাশ। সরকারের সমালোচনা করে ডাকসু ভিপি বলেন, যারা একসময় নিজেরাই ফ্যাসিবাদের শিকার ছিলেন, তাদের শাসনামলে এমন অযৌক্তিক গ্রেপ্তার ও হয়রানি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে জামায়াতকর্মী বিবি সাওদার মুক্তি ও সকল প্রকার প্রতিহিংসামূলক রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছি। সরকারের মনে রাখা উচিত, ক্ষমতার দাপটে নিপীড়ন শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই শুভ হয় না।

ডা. মাহমুদা মিতু

এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. মাহমুদা মিতু সমালোচনা করে বলেন, “বাহ, হাসিনা হয়ে উঠতে বেশি সময় নেন নি আপনারা। ৩ বছরের বাক প্রতিবন্ধী শিশুর মা’কে ফেসবুক পোস্টের কারণে মামলা দিয়ে গ্রেফতার করানো হয়েছে। বিএনপির কবর খোড়ার জন্য বিএনপি নিজেই যথেষ্ট হবে ইনশা আল্লাহ। অতি দ্রুত সওদাকে মুক্তি দিন। না হলে এর পরিণতি ভালো হবে না।” অপর আরেকটি পোস্টে তিনি বলেন, সওদা সুমীর জামিন হওয়াটা বড় বিষয় নয়। বড় বিষয় হলো, হাসিনার আমলের মতোই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পদ্ধতি বদলায়নি, শুধু মানুষ বদলেছে। আজও সেই পুরনো স্ক্রিপ্টেই চলছে সব। অতি দ্রুত এসব মামলা নাটক বন্ধ করতে হবে।”

জাবি সংবাদদাতা জানান, ভোলায় ‘বিবি সাওদা ইসলাম’-কে গ্রেফতারের মাধ্যমে বাকস্বাধীনতা হরণের অভিযোগ তুলে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় ছাত্রশক্তি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় ছাত্রশক্তি জাবি শাখার দপ্তর সম্পাদক কাজী মেহরাব তূর্য স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই অমানবিক হয়রানির প্রতিবাদ জানানো হয় ।

অবিলম্বে বিবি সওদা ইসলামের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করে বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাই বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ছিল একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের অবৈধ ব্যবহার করে নাগরিকের মৌলিক অধিকার, বিশেষ করে বাকস্বাধীনতা ও সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার অধিকার সংকুচিত করা হচ্ছে।

জাতীয় ছাত্রশক্তি মনে করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাবের ব্যবহার এবং ভিন্নমত দমনের এই প্রক্রিয়া জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও প্রত্যাশার পরিপন্থী।সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য অংশ। ভিন্নমত দমন ও ক্ষমতার অপপ্রয়োগের মাধ্যমে সেই জবাবদিহিতার পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংগঠনটি নাগরিকের কণ্ঠরোধ করতে আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করাসহ, ভিন্নমত পোষণ করলেই গ্রেফতারের সংস্কৃতি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।