ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনে পর্যটক ভিসাসহ ব্যবসায়িক ও কর্মসংস্থান ভিসা ব্যতীত সব ধরনের ভিসা কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। গত বুধবার থেকেই উপ-হাইকমিশনে কনস্যুলার সেবা ও সাধারণ ভিসা প্রদান কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। ফলে আপাতত ভারতীয় নাগরিকদের জন্য পর্যটকসহ অন্যান্য শ্রেণির ভিসা দেওয়া হচ্ছে না। তবে ব্যবসায়িক ও কর্মসংস্থান (ওয়ার্ক) ভিসা কার্যক্রম চালু রয়েছে। বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। গত বুধবার ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও একই তথ্য জানানো হয়। এর আগে ভারতও বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা বন্ধ করে দিয়েছিল। এদিকে ভারতের মুম্বাইয়ে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ করেছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)। গত বুধবার কোনো ধরনের আগাম সতর্কতা ছাড়াই ভিএইচপির প্রায় দেড় শতাধিক নেতাকর্মী বাংলাদেশবিরোধী স্লোগান দিয়ে মিশনের প্রায় ৩০ মিটারের মধ্যে চলে আসে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তি হয়। মুম্বাই থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে একাধিক কূটনৈতিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এছাড়াও গত ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ কলকাতার বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশন রাখতে দেবেন না বলে হুমকি দিয়েছেন ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ শাখার প্রধান শুভেন্দু অধিকারী।

ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ প্রসঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জানান, নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশের যেসব মিশনে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, আপাতত সেসব মিশনে ভিসা সেকশন বন্ধ রয়েছে। ভারতের কলকাতা, মুম্বাই ও চেন্নাইয়ের বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য পর্যটক ভিসা ‘সীমিত’ করা হয়েছে।

এদিকে এর আগে গত ২২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের পাশাপাশি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় সহকারী হাইকমিশন এবং শিলিগুড়ির ভিসা সেন্টার থেকেও ভিসা প্রদান ও কনস্যুলার সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। ওই সিদ্ধান্তের পর থেকেই এসব মিশনে পর্যটক ভিসা প্রদান ও কনস্যুলার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কলকাতা উপ-হাইকমিশনের এ সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ের কথা মাথায় রেখেই বাংলাদেশ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়। আগামী মাস দুয়েকে বাংলাদেশের ভিসা পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা ভারতীয় পর্যটকদের জন্য নেই। দিল্লির বাংলাদেশ দূতাবাস এবং আগরতলার উপদূতাবাস থেকে পর্যটক ভিসা দেওয়া আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। শুধু কলকাতার বাংলাদেশ উপদূতাবাস থেকে এই পরিষেবা চালু রাখা হয়েছিল। গত বুধবার থেকে তা-ও বন্ধ করে দেওয়া হল। ফলে গোটা ভারতে কোথাও আর বাংলাদেশে আসার জন্য পর্যটক ভিসা আপাতত পাওয়া যাবে না।

কলকাতার বাংলাদেশ উপদূতাবাস বা দিল্লির দূতাবাস এ বিষয়ে কোনও বিবৃতি প্রকাশ করেনি বলেও জানিয়েছে ভারত সরকার। তবে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয়দের জন্য এমপ্লয়মেন্ট ভিসা (কর্মসূত্রে বাংলাদেশে আসার জন্য), বিজনেস ভিসা (ব্যবসায়িক কাজে বাংলাদেশে আসার জন্য) এখনও চালু আছে।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের জন্যও ভিসা দেওয়া হবে। কারণ, এই ধরনের ভিসা বহুস্তরীয় যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেওয়া হয়। তাই কতজন ভারত থেকে বাংলাদেশে যাচ্ছেন, কী কাজে যাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন বা থাকছেন, সে সব তথ্য কর্তৃপক্ষের কাছে বিশদে থাকে। ফলে তাদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় সুনিশ্চিত রাখা অপেক্ষাকৃত সহজ হয়। পর্যটকদের ক্ষেত্রে তা অতটা সহজ হয় না। অর্থাৎ, কাজের জন্য ভারতীয়রা বাংলাদেশে আসার ভিসা পেতে পারেন, বেড়ানোর জন্য নয়। তবে ‘বিশেষ বিশেষ’ ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকদের জন্য ভিসা দেওয়া হতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা উপদূতাবাস কর্তৃপক্ষের বিবেচনার ওপর। মূলত নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণেই বাংলাদেশ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনও আসন্ন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভারতীয়দের পর্যটন ভিসা না-দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছে ভারত।

মুম্বাইয়ে বাংলাদেশ মিশনের সামনে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বিক্ষোভ: সূত্রগুলো জানায়, প্রতিদিনের মতো বুধবার বিকেল ৫টায় অফিস শেষে মুম্বাইয়ে বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনার ফারহানা চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মিশন ত্যাগ করে নিজ নিজ বাসার উদ্দেশে রওনা হন। স্থানীয় সময় বিকেল সোয়া ৫টার দিকে কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের উল্টো পাশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের প্রবেশমুখে ভিএইচপির প্রায় দেড়শ নেতাকর্মী জড়ো হন। হঠাৎ করে বিক্ষোভকারীদের এমন উপস্থিতিতে সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়েন। এ সময় বিক্ষোভকারীরা ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে ‘বাংলাদেশ মুর্দাবাদ’সহ নানা স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে উভয় পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। প্রায় আধা ঘণ্টা অবস্থানের পর পুলিশের বাধার মুখে ভিএইচপির বিক্ষোভকারীরা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের বিপরীত দিকে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের সামনে থেকে সরে যায়। মুম্বাইয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাধারণত বাংলাদেশ মিশনের সামনে অল্পসংখ্যক পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। তবে গত কয়েক দিন ধরে সেখানে অতিরিক্ত ১৫জন পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

‘কলকাতায় বাংলাদেশ হাইকমিশন রাখতে দেব না’, হুমকি বিজেপি নেতা শুভেন্দুর: গত ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় বাংলাদেশের উপদূতাবাসের সামনে বাংলাদেশের ময়মনসিংহে হিন্দু যুবক দীপু দাস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শুভেন্দুর নেতৃত্বে বিক্ষোভ করে হিন্দুত্ববাদী বেশ কয়েকটি সংগঠন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে বাংলাদেশের উপদূতাবাসে একটি স্মারকলিপি দেওয়ার চেষ্টা করে তারা। তবে পুলিশি বাধায় দূতাবাসের কাছে পৌঁছাতে পারেনি, এতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীও রাস্তায় বসে পড়েছিলেন। এ সময় তিনি ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেন, ‘দীপুকে জীবন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে মারা হয়েছে। আমরা বাংলাদেশ হাইকমিশনকে এখানে থাকতে দেব না। তাদের এটি তালাবদ্ধ করতে হবে। আগামী ২৪ ডিসেম্বর সীমান্তে এক ঘণ্টার প্রতীকি অবরোধ হবে এবং ২৬ ডিসেম্বর আমরা আবারও এখনো জড়ো হবো।’