তিন দফায় বেড়েছে দামও

রাজধানীতে আরও ৫০ টি বিশুদ্ধ পানির এটিএম বুথ বসাচ্ছে ঢাকা ওয়াসা। চলতি সপ্তাহেই ঠিকাদারদের কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হবে। এরপর মাস দুয়েকের মধ্যেই বুথ বসানোর কাজটি শেষ করার পর আরও বুথ বসানোর দিকে এগুতে চায় ওয়াসা। এদিকে, এটিএম বুথের পানির দাম বাড়িয়েছে সংস্থাটি। ১ মার্চ রোববার থেকে এই বাড়তি দরে পানি কিনছে গ্রাহক। এ নিয়ে তিন দফায় পানির দাম বাড়াল ঢাকা ওয়াসা।

গ্রাহক চাহিদার তুলনায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দীর্ঘদিন ধরেই চলছে রাজধানী ঢাকায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত এলাকায় এই সংকট প্রকট আকার ধারন করায় ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা) সুলভ মূল্যে পানির চাহিদা মেটাতে চালু করে এটিএম (অটোমেটেড টেলার মেশিন) বুথ বসিয়ে প্রি-পেইড কার্ডের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি বিক্রি। ২০১৬ সালের ৬ অক্টোবর ডেনমার্কের গ্রুন্ডফোজ কোম্পানির সহায়তায় স্থাপিত ফকিরেরপুলের এটিএম বুথটি উদ্বোধনের মাধ্যমে ঢাকায় প্রি-পেইড কার্ডের মাধ্যমে পানি সরবরাহ শুরু করে ওয়াসা। এ ছাড়া প্রথম পর্যায়ে ওয়াসার পাইলট প্রকল্পের আওতাধীন রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আরও ৫টি ওয়াটার এটিএম বুথ স্থাপন করে তারা। আমেরিকার কোম্পানি ড্রিংকওয়েলের সহায়তায় বুথগুলো স্থাপন করা হয়, মুগদা, মিরপুরের শেওড়াপাড়া, ঢাকা পলিটেকনিক, কদমতলা ও সিদ্ধেশ্বরী বয়েজ অ্যান্ড কলেজ এলাকায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের অনুদানে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ৩০টি পানির বুথ চালু করা হয়। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিশুদ্ধ পানির জন্য এটিএম বুথ চালু করে ঢাকা ওয়াসা।

ঢাকা ওয়াসা সুত্র জানায়, বর্তমানে বিশুদ্ধ পানির এটিএম বুথের সংখ্যা ৩০২টি। গ্রাহক সংখ্যা ৭ লাখ ৮০ হাজার। প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ লিটার পানি বিক্রি হয়। ভবিষ্যতে ঢাকায় আরও ২০০ এটিএম বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর অংশ হিসেবেই আরও ৫০ টি এটিএম বুথ বসানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে ওয়াসা। এর ফলে বুথের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৫২ টিতে। এই বুথের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে সহস্রাধিক করার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির।

বুথের অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু নিম্নবিত্তই নয়, মধ্যবিত্ত এবং অনেক উচ্চবিত্তও এখন পানির এটিএম বুথের গ্রাহক। এখন আর তাদের পানি ফোটানোর কষ্ট করতে হয় না। বুথের পানি দিয়েই চলছে। যে কোনো একটি পানির এটিএম বুথে গিয়ে দায়িত্বরত অপারেটরকে বললেই কার্ড পাওয়া যায়। এজন্য সঙ্গে নিতে হবে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, দুই কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি ও ৫০ টাকা (ফি)। এটিএম কার্ডে একবারে সর্বোচ্চ ৯৯৯ টাকা আর সর্বনিম্ন ১০ টাকা রিচার্জ করে পানি নেওয়া যায়। কার্ড রিচার্জও করেন বুথ অপারেটর। তবে এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও রিচার্জের পদ্ধতি চালু হয়েছে।

ওয়াসা ও ড্রিংকওয়েল বলছে, যেসব এলাকায় পানির সংকট আর পানিতে গন্ধ ও দূষণ রয়েছে, সেসব এলাকায় গ্রাহক বেশি। এসব এলাকার মধ্যে মুগদা, কদমতলা, মিরপুর, ফকিরাপুল ও পুরান ঢাকায় গ্রাহক বেশি। ২০২৫ সালের মধ্যে রাজধানীতে মোট ৫০০টি এটিএম বুথ চালুর বিষয়ে ড্রিংকওয়েলের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও নানা কারণে তা আর করা হয়নি। এখন সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ওযাসা।

জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মো: আবদুস সালাম ব্যাপারী রোববার দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, গ্রাহক চাহিদার তুলনায় পানির এটিএম বুথের সংখ্যা কম। রাতারাতি সেটার সংখ্যা বাড়ানোও যায়না। চাহিদা ও এলাকা ভিত্তিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে এখন এটিএম বুথগুলো বসানোর কাজ শুরু করছি। এই বুথ বসানোর কাজ চলমান থাকবে, পর্যায়ক্রমে ঢাকা শহরের গ্রাহকের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করবে ওয়াসা। তিনি জানান, পানির ব্যবস্থা ওয়াসা করবে। মেশিনপত্রও কেনবে ওয়াসা। শুধুমাত্র ঠিকাদার নির্ধারিত স্থানে এটিএম বুথগুলো বসানোর কাজ করবে। তিনি জানান, এই বুথগুলো বসানোর জন্য বিগত দিনে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে ওয়াসার অসম চুক্তি হয়েছিল। এখন সেসব চুক্তি বাতিল করে ওয়াসার লাভের অংশটা যাতে বেশি হয়, সে মোতাবেক চুক্তি করা হচ্ছে। তিনি জানান, ঢাকা শহরে ১৩২০ টি ডিপটিউবওয়েল রয়েছে। এই ডিপটিউবওয়েল কেন্দ্রীকই পানির এটিএম বুথ বসানোর চিন্তা রয়েছে ওয়াসার।

বাড়লো বুথের পানির দাম: ১ মার্চ রোববার থেকে এটিএম বুথের পানির দাম বাড়ানো হয়েছে। এর আগে প্রতি লিটার পানি ভ্যাটসহ গ্রাহক কিনতেন ৮০ পয়সায়। এখন প্রতি লিটার কিনতে হচ্ছে ২০ পয়সা বাড়তি দামে ১০০ পয়সায়। প্রতি লিটার পানি এখন এক টাকা (ভ্যাট+ট্র্যাক্সসহ)।

দাম বাড়ার কারণ হিসেবে ওয়াসার কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে এটিএম বুথ পরিচালনা ও রক্ষনাবেক্ষনসহ বৈশ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পানির দাম বাড়িয়েছে ওয়াসা। যদিও একই কথা বলে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট এটিএম বুথের পানির দাম দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছিল। সে সময়, ৪০ পয়সা লিটার পানির দাম এক লাফে ৮০ পয়সা করা হয়েছিল। তখন বলা হয়, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা কারণে ওয়াসার বিশুদ্ধ খাবার পানির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ওই বছরের শুরুতেই দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রস্তাবটি পাস হয় এপ্রিল মাসে। শুরুতে প্রতি লিটার পানির দাম রাখা হয়েছিল ৪০ পয়সা। তিন দফায় দাম বেড়ে এখন এক টাকায় দাঁড়াল এক লিটার পানির দাম।

জানা গেছে, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পানির দাম বাড়ানোর অফিস আদেশ জারি করেন ওয়াসা সচিব এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। ওই অফিস আদেশে বলা হয়, গত ২৮ জানুয়ারি ঢাকা ওয়াসার কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটির ১৪তম সভায় অপারেশন অ্যান্ড মেনটেনেন্স খরচ বাড়ায় ওয়াটার এটিএম বুথের প্রতি লিটার পানির মূল্য ০ দশমিক ৮০ (ভ্যাট+ট্যাক্সসহ) টাকা থেকে ১ টাকা (ভ্যাট+ট্যাক্সসহ) বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। যা ১ মার্চ থেকে কার্যকর হবে।

জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার উপপ্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মো. ইমরুল হাসান রোববার দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, সম্প্রতি ঢাকা ওয়াসার বোর্ড সভায় এটিএম বুথের পানির দাম ২০ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্ত রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে। ইমরুল হাসান বলেন, ওয়াসার এটিএম বুথ পরিচালনা ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে পানিতে যে কেমিক্যাল, ফিল্টার ব্যবহার করা হয় এগুলোর দাম বেড়েছে। জনবলের মজুরিও বেড়েছে। এ কারণে পানির দাম বাড়ানো হয়েছে।

২০১৯ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় বলা হয়, ঢাকা ওয়াসা পাইপলাইনের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ করতে ব্যর্থ। ৯১ শতাংশ গ্রাহক খাবার পানি ফুটিয়ে পান করেন। পানি ফুটিয়ে পানের উপযোগী করতে বছরে ৩২২ কোটি টাকার গ্যাস খরচ হয়।

জানা গেছে, ঢাকার যেসব এলাকায় পানির মান খারাপ সেসব এলাকায় সুপেয় এ পানির চাহিদা ব্যাপক। কম সময়ের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ঢাকা ওয়াসার ওয়াটার এটিএম বুথ প্রকল্প। তবে ঢাকা ওয়াসা হঠাৎ পানির দাম বাড়ানোর কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন গ্রাহকেরা। তাঁদের অভিযোগ, ঢাকা ওয়াসা বাসাবাড়িতে যে পানি সরবরাহ করে তা বিশুদ্ধ নয়। গ্যাস পুড়িয়ে পানি ফুটিয়ে পান করতে হয়। এমন অবস্থায় ওয়াটার এটিএম বুথের বিশুদ্ধ পানি জনপ্রিয় হয়। কিন্তু দফায় দফায় পানির দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।

২০২২ সালের ১৮ নভেম্বর রাজধানীবাসীকে কম খরচে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে যৌথভাবে ওয়াটার এটিএম বুথ স্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অ্যাওয়ার্ড ফর করপোরেট এক্সিলেন্স (এসিই) পুরস্কার পেয়েছে ড্রিংকওয়েল নামক সংস্থাটি।