কেমন বাংলাদেশ গড়বে সে প্রশ্ন জনমনে
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেশ। এক মাসের কম সময়ের ব্যবধানেই জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি হচ্ছে দেশের জনগণ। এই নির্বাচনে বিজয়ী দল কেমন বাংলাদেশ গড়বে, সে প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে। দেশের রাজনীতি কোন পথে হাঁটবে, আর ভবিষ্যতের গতি কোন দিকে ছুটবে, তার উত্তর জানতে অপেক্ষায় মানুষ। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সময় অনুযায়ী চলতি সপ্তাহ থেকেই শুরু হবে প্রচারণা। তবে এর আগে রাজনৈতিক দলগুলো ব্যস্ত তাদের শেষ মুহূর্তের নির্বাচনী কাজে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন। জানা গেছে, নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে শীর্ষ দল থেকে শুরু করে সবার সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জনগণের ইশতেহার প্রকাশ। অধিকাংশ দলই সংষ্কার ও পরিবর্তনের অঙ্গিকারকেই সামনে রেখে ইশতিহার প্রনয়ণ করছে।
বিশ্লেষকদের মত, ইশতেহারে জুলাই আকাক্সক্ষা, দুর্নীতি, সুশাসনের পাশাপাশি আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান পরিষ্কার না করলে ভোটাররা তা প্রত্যাখ্যান করবেন। শুধু প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়, নতুন বাস্তবতায় জ্ঞাননির্ভর ইশতেহার প্রণয়নের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। গণমুখী ও বাস্তবসম্মত ইশতেহার না দিতে পারলে ভোটের মাঠ থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কা থাকবে বলে মত বিশ্লেষকদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, ইশতেহারে সুশাসন, টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মানুষের দারিদ্র বিমোচন, আমাদের পররাষ্ট্র নীতিটা কী হবে, এসব বিষয় স্পষ্ট করে থাকতে হবে। কথার ফুলঝুরি দিয়ে যদি কেউ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করে বা গণতন্ত্রের পরিবর্তে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার ইঙ্গিত থাকে, তাহলে দেশের মানুষ সেটি গ্রহণ করবে না।
জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনে কৃষি, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা ও নাগরিক সুবিধাসহ আটটি প্যাকেজ নিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করতে যাচ্ছে বিএনপি। এরই অংশ হিসেবে জনগণের সামনে এর মধ্যেই নিজেদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছে দলটি। এ লক্ষ্যেই নির্বাচনের ইশতেহার তৈরিতে কাজ করছে বিএনপি। শিগগিরই ফ্যামিলি, ফার্মার্স ও হেলথ কার্ডের মত সুবিধা সম্বলিত আট দফার প্যাকেজ পরিকল্পনা ও পূর্ব ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব নির্ভর ইশতেহার ঘোষণা করবে বিএনপি।
জানা গেছে, বয়স্ক ও নারী ভোটারদের জীবনযাত্রার বিষয়টি বিশেষ নজরে রাখছে বিএনপি। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং মসজিদ-মাদ্রাসাভিত্তিক ধর্মীয় নেতাদের মাসিক সম্মানি ভাতাসহ জনকল্যাণমুখী এই ৮টি খাতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বিএনপির ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বিএনপি নির্বাচিত হলে প্রথম ১৮ মাসে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের কথা জানিয়েছে দলটি।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হোসেন টুকু বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে ৩১ দফা দিয়েছেন, এটাতো অনেক আলোচনা, পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ করে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এটা দিয়েছেন। এসব কার্ড যে দেবো, এটা নিয়ে আমাদের অনেক বড় পরিকল্পনা আছে। আশা করি এ পরিকল্পনাগুলো যদি বাস্তবায়ন করতে পারি তাহলে মানুষ যে সমস্যাগুলো প্রতিনিয়ত ফেস করে, সেটা থেকে অনেকটা মুক্তি পাবে। এছাড়া জুলাই আকাক্সক্ষার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও থাকবে ইশতেহারে।
দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিয়ে মেধাভিত্তিক ইশতেহার তৈরির পরামর্শ দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ। তিনি বলেন, আমি যদি দলীয়করণ করি তাহলে তো এটা শেষ হয়ে যাবে। আর দলীয়করণ না, মেধা। এ মেধার জন্যই তো এতকিছু হলো। মেধাকে ধারণ করে মেরিটোক্রেসি যেটা বলি, এটাতে স্টাবলিশড করা।
সূত্র মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় ইশতেহার তৈরিতে অনলাইনে জনমত নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইশতেহারে দলটি শিক্ষা, নারীর কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও জুলাই গণ অভূত্থান ও জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিয়েই ইশতেহারে দুর্নীতিকে লাল কার্ড দেখানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন জামায়াত নেতারা। পুরানো ছকে ইশতেহার সাজানোর পথে না হেঁটে ভিন্ন কৌশলে এগোচ্ছে সংগঠনটি।
আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন হবে, সেই রূপরেখা নির্ধারণে ভোটারদের সরাসরি যুক্ত করতে অ্যাপ চালু করেছে দলটি। দেশ গড়ার পরিকল্পনায় অংশীদার হতে নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এছাড়া তরুণ প্রজন্মের ভাবনা ও প্রত্যাশা জানতে চালু করা হয়েছে জেন-জি জিজ্ঞাসা। এই প্ল্যাটফর্মে তরুণরা সরাসরি প্রশ্ন তুলতে পারছেন রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে।
সূত্র মতে, জুলাই চেতনাকে ধারণ করে তৈরি হবে জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহার। এতে দেশের কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রকাঠামোতে ব্যাপক সংস্কারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। থাকছে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ে তোলার কঠোর বার্তা। সততা, দেশপ্রেম, দুর্নীতিকে ‘না’ বলতে হবে। ‘দুর্নীতি করব না-দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেব না।’ এমন স্লোগান থাকছে জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকবে দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে। শিক্ষাব্যবস্থার শুরু থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগড়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে এই খাতের নৈরাজ্য দূর করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা থাকছে। ‘কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতি অনুসরণ করা হবে পররাষ্ট্রনীতিতে।
জামায়াতের খসড়া ইশতেহার সম্পর্কে জানতে চাইলে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ৫ হামিদুর রহমান আজাদ গণমাধ্যমকে জানান, শিক্ষা সংস্কার, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন এবং বেকারত্ব দূরীকরণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা এমন দেশ উপহার দিতে চাই যেখানে বাংলাদেশ হবে দুর্ণীতি মুক্ত, বেকারত্ব মুক্ত, বৈষম্যহীন। আগে নিজেদের আমরা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার আওতায় আনবো। পাশাপাশি ইশতেহারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও টেকসই একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়া হবে। এছাড়াও নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষিবান্ধব নীতি, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, নারীর কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, দিনমজুর, জেলে, কৃষক তাদের জন্য আমরা ফ্যাসিলিটি বাড়াবো। গৃহিনীদের জন্য আমরা প্রণোদনা রাখবো। এছাড়া আধিপত্যবাদ বিরোধী অবস্থান থাকবে আমাদের।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী নির্বাচন অন্য সব নির্বাচন থাকে ভিন্ন। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে জুলাই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের পথ দেখাতে হবে ইশতেহারে। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কিভাবে কাজ করবে সরকার সে ব্যাপারেও স্পষ্ট অবস্থান জানতে চায় মানুষ। তা না হলে পুরানো ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে।
জানা গেছে, শীর্ষ সব দলই ইশতেহার তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে। এখন চলছে শেষ মূহুত্বের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা। জানা যায়, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা পৌনে ১৩ কোটি। এর মধ্যে একেবারে নতুন ভোটার আছে কমবেশি এক কোটি। এই বিশালসংখ্যক ভোটার এবারই প্রথম ভোট দেবেন। ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এবার তরুণ ভোটাররা হয়তো নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে তরুণ সমাজের মধ্যে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ-উদ্দীপনা অনেক বেশি। ফলে তরুণ প্রজন্মের আকাক্সক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সবাই।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতোমধ্যে নতুন সংবিধান প্রণয়ন, জুলাই অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি ও বিচার, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারসহ ২৪ দফা ঘোষণা করেছে। এবার এই ২৪ দফার আলোকে নির্বাচনি ইশতেহার চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল এনসিপি। সরকারে গেলে কীভাবে দেশ পরিচালনা করা হবে-সেটির রূপরেখাসহ নানা প্রতিশ্রুতি থাকবে ইশতেহারে। এছাড়া তরুণ ও ছাত্রসমাজকে অগ্রাধিকারে রাখা হবে। একই সঙ্গে নারীর উন্নয়নসহ ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা ও আইন সংস্কার গুরুত্ব পাবে।
এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নির্বাচনি মিডিয়া উপকমিটির প্রধান মাহাবুব আলম বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে ইশতেহার তৈরির কাজ প্রায় শেষের দিকে। আমরা চাই একটি আদর্শ ইশতেহার তৈরি করতে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, প্রথম ইশতেহারে থাকা উচিৎ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় সংস্কার এবং বিচার এই দুইটা ইশতেহারে আসা দরকার বলে আমি মনে করি। বিপ্লবকে ধারণ করার জন্য যে জাতীয় ইশতেহার প্রয়োজন, আমরা সেটিই দেখতে চাই। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্বাচনী ইশতেহারে গৎবাঁধা প্রতিশ্রুতি না দিয়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সংস্কার ও বিচারের সময়সীমা এবং তরুণদের চাওয়াকে গুরুত্ব দেবার আহ্বান এ রাষ্ট্র চিন্তদের।