দেশব্যাপী তীব্র তাপপ্রবাহ এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্য সামনে রেখে পুনরায় অনলাইন ক্লাসের ধারণাটি আলোচনায় এসেছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর নানাবিধ বিধিনিষেধ আরোপের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভার্চুয়াল পাঠদানের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এই পদ্ধতি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে কতটা কার্যকর হবে এবং শিক্ষার্থীদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব কী হতে পারেÑতা নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় কি আদৌও হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে অনলাইন ক্লাস চালু করলে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয় কিছুটা সম্ভব। বড় বড় ক্যাম্পাসগুলোতে এসি, ফ্যান ও লাইট বন্ধ থাকলে জাতীয় গ্রিডে চাপ কমবে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। লাখ লাখ শিক্ষার্থী যখন বাড়িতে বসে ডিভাইস ও ফ্যান ব্যবহার করবে, তখন আবাসিক পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। ফলে সামগ্রিকভাবে সাশ্রয়ের পরিমাণ খুব একটা সন্তোষজনক নাও হতে পারে।
শিক্ষার্থীদের সম্ভাব্য ক্ষতি ও চ্যালেঞ্জ
অনলাইন ক্লাসের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ‘লার্নিং লস’ বা শিখন ঘাটতি। করোনাকালীন অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে:
ডিজিটাল বৈষম্য: গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইন্টারনেটের গতি ও ডিভাইসের প্রাপ্যতা নিয়ে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।
মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের সামনে বসে থাকায় শিক্ষার্থীদের চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা এবং একঘেয়েমি তৈরি হয়। এর ফলে সামাজিক মেলামেশার সুযোগ কমে যাওয়ায় তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ব্যবহারিক শিক্ষার অভাব: বিজ্ঞান বা কারিগরি বিষয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ল্যাবরেটরি বা ব্যবহারিক ক্লাস ছাড়া শুধু অনলাইনে শিক্ষা গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব।
আগ্রহ হারানো: সরাসরি শিক্ষকের সান্নিধ্য না থাকায় শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোযোগ হারিয়ে ফেলে এবং পাঠদানে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
অভিভাবক ও শিক্ষকদের উদ্বেগ
রাজধানীর একজন অভিভাবক বলেন, অনলাইন ক্লাস মানেই হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া। এতে পড়াশোনার চেয়ে গেমস বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তি বেশি বাড়বে। বিদ্যুৎ বাঁচানোর চেয়ে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বাঁচানো বেশি জরুরি।
অন্যদিকে, শিক্ষকরা বলছেন যেÑএকটি ক্লাসরুমে যে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়, জুম বা গুগল মিটে তা সম্ভব নয়। লোডশেডিংয়ের কারণে অনলাইন ক্লাসও অনেক সময় বিঘ্নিত হয়, যা শিক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট করে।
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা জরুরি হলেও শিক্ষার বিনিময়ে তা কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, অনলাইন ক্লাসের দিকে না ঝুঁকে বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সময়সূচি পরিবর্তন করে বা গরমের তীব্রতা কমার অপেক্ষা করে সরাসরি পাঠদান অব্যাহত রাখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে দেশ এক বিশাল মেধা সংকটের মুখে পড়তে পারে।