২০১৮ সালের রাতের ভোটসহ আওয়ামীলীগ আমলের বিতর্কিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কলংক তিলক লেগে আছে গোটা পুলিশ বাহিনীর কপালে। এই কলংক তিলক মুছতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পেশাদারিত্ব ও সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে নানা পরিকল্পনাসহ ভোটের আগে ও পরের আইনশৃংখলা রক্ষায় পুলিশকে কঠোর হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেজন্য শুরু থেকেই নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বাহিনীর দেড় লক্ষাধিক সদস্যকে দেয়া হয়েছে ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ। সর্বশেষ, পুলিশ সদর দফতর থেকে নির্বাচনের দিন ২২ ধরনের কাজ না করতে মানা করা হয়েছে। এছাড়া, দেয়া হয়েছে আরও অর্ধশতাধিক নির্দেশনাও। এর ব্যত্যয় ঘটলে নেয়া হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও।
পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত আচরণের মাধ্যমে জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে চায়। এরই অংশ হিসেবে নির্বাচনে নিরপেক্ষভাবে আইনানুগ দায়িত্ব পালনে পুলিশ সদর দফতর ৭৩ দফা নির্দেশনা সম্বলিত একটি বুকলেট প্রকাশ করেছে। এই বুকলেট নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে এই বুকলেট প্রত্যেকের সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে রয়েছে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কি করা যাবে, কি করা যাবেনা। বুকলেটে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে ধৈর্য ও সংযম বজায় রেখে আইনানুগ দায়িত্ব পালন, উসকানি এড়িয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলা ও সৌজন্যতা বজায় রেখে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, ইউএনডিপি এবং জাতিসংঘের ড্রাগস এন্ড ক্রাইম অফিসের সহযোগিতায় পুলিশ সদর দফতর এক লাখ ৬০ হাজার বুকলেট ছাপিয়েছে। গত সপ্তাহে এই বুকলেট ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার, সকল মহানগর পুলিশসহ পুলিশের সব ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ সদস্যরা নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে মোতায়েন হতে কমান্ড সার্টিফিকেট (সিসি) নেওয়ার সময় একটি করে বুকলেট পাবেন।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন গতকাল মঙ্গলবার দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনানুগ নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনে আমরা বদ্ধ পরিকর। এরই অংশ হিসেবে নির্বাচনি দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় নিয়ে বুকলেট তৈরি করা হয়েছে। নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বুকলেটের নির্দেশনা অনুসরণ বাধ্যতামূলক। ইতোমধ্যে পুলিশের সব ইউনিটে এই বুকলেট পাঠানো হয়েছে।
যে ২২ ধরনের কাজ করতে মানা
প্রার্থী অথবা প্রার্থীর এজেন্ট কিংবা সমর্থকের নিকট হতে খাবার/উপঢৌকন/অন্য কোনো সুবিধা নেওয়া যাবে না। প্রার্থীদের সঙ্গে ছবি তোলা, আলাপচারিতা বা ঘনিষ্ঠ হওয়া যাবে না। ভোটার বা নির্বাচন অফিসারের কাজে অযথা হস্তক্ষেপ করা যাবে না। প্রিজাইডিং অফিসারের অনুমতি ছাড়া ভোটকক্ষে প্রবেশ করা যাবে না। ভোটারকে কোনো প্রার্থী বা প্রতীকের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রভাবিত করা যাবে না। কোনো রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা সমর্থকের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করা যাবে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে না গেলে বলপ্রয়োগ বা লাঠিচার্জ করা যাবে না। কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর মিছিলে অংশগ্রহণ বা কার্যালয়ে উপস্থিত থাকা যাবে না। রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত পছন্দ প্রকাশ অথবা কোনো বক্তব্য প্রদান করা যাবে না। গালিগালাজ, হুমকি বা অবমাননাকর কোনো আচরণ প্রদর্শন করা যাবে না। নির্বাচনি আইন ও বিধিমালার পরিপন্থী কোনো নির্দেশ পালন করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক পোস্ট শেয়ার বা কমেন্ট প্রদান করা যাবে না। প্রচারণায় অযাচিত হস্তক্ষেপ বা একপাক্ষিক সহায়তা প্রদান করা যাবে না। দায়িত্বকালীন সময়ে অপ্রয়োজনে ফোন ব্যবহার বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থাকা যাবে না। এছাড়া ভোটগ্রহণের দিন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় মোবাইল ফোন ব্যবহার একদমই নিষিদ্ধ। নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনকালে অনৈতিক আচরণ কিংবা অসদাচরণ করা যাবে না। নির্বাচন সংক্রান্ত সংবেদনশীল কোনো তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। ভোটের ফলাফল/সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থী সম্পর্কে পূর্বানুমান বা কথোপকথন করা যাবে না। অফিসিয়াল রিকোয়েস্ট ছাড়া কোনো অবস্থাতেই কোনো সংবেদনশীল ঘটনার ছবি/ভিডিও কারও কাছে প্রেরণ করা যাবে না। কোনো ধরনের ব্যক্তিগত আলাপে মশগুল হওয়া যাবে না। একত্রে জড়ো হয়ে উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি করা যাবে না। এছাড়া জনাসমাগম স্থলে খোলা জায়গায় যত্রতত্র আহার থেকে বিরত থাকা, ফুটপাত কিংবা টং দোকানে না বসা এবং বাদাম, ভাপা পিঠা, চানাচুর, জিলাপি, বিস্কুট, কলা ইত্যাদি মুখরোচক খাবার খাওয়া এবং অশোভন পোশাক পরিধান ও অপেশাদার কাজ থেকে বিরত থাকা।
বুকলেটে আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, নির্বাচনকালীন কোনো সহিংসতা, মারামারি বা সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আইনানুগ ও পরিমিত বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, কোনো ধরনের গুজব, অপপ্রচার বা মিথ্যা প্রচারে বিচলিত না হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন অফিসারদের নির্দেশনা ও সহযোগিতা নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রার্থী কিংবা তাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচনি ক্যাম্পে ভোটারগণকে কোনোরূপ কোমল পানীয় বা খাদ্য পরিবেশন বা কোনোরূপ উপঢৌকন প্রদান করতে পারবেন না।
নির্বাচনকালে করণীয়
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা, নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। ভোটারদের অবাধ ও স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা, কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর পক্ষে কিংবা বিপক্ষে অবস্থান না নেওয়া, স্থানীয় জন নিরাপত্তা রক্ষা ও ভোট গ্রহণ চলাকালে শৃঙ্খলা রক্ষা ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করা। এছাড়া সকল রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা সমর্থখদের প্রতি সমতা বা নিরপেক্ষাতা রেখে আইনগত সহয়তা করা। ভোটকেন্দ্র ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের মূল দায়িত্ব। একই সঙ্গে নারী, প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপদে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা রক্ষা, জাল ভোট, সহিংসতা বা আচরণবিধি লঙ্ঘনের চেষ্টা হলে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া, প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান এবং যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম এন্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার দৈনিক সংগ্রামকে জানান, বুকলেটের মাধ্যমে পুলিশের করনীয় এবং বর্জনীয় সম্পর্কে ৭৩ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশের বর্জনীয় ২৩ ধরনের কাজ বলে দেওয়া হয়েছে। করনীয় কি হবে সে সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। পাশপাশি প্রার্থীদের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু আরচরবিধি, ভোট কেন্দ্রে নিয়োজিত অফিসার ও ফোর্সদের জন্য সতর্কবার্তা, স্টাইকিং টিম, মোবাইল টিমের কাজ কি হবে সবকিছু বুকলেটে উল্লেখ করা হয়েছে। ভোটের মাঠে পুলিশের কোন কর্মকর্তা বা সদস্যদের অপেশাদার আচরণ বা পক্ষপাতমূলক আচরণ বরদাশত করা হবে না। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ২০১৪ থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামীলীগ সরকারের অধীনে ৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। ৩টি নির্বাচনেই পুলিশ বিতর্কিত ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের রাতের ভোটের মাধ্যমে আওয়ামীলীগকে সরকারে রাখতে পুলিশের ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবেও বিতর্ক তৈরী করেছে। এছাড়া ২০১৪ এবং ২০২৪ সালের ভোটেও পুলিশ দলীয় মনোভাব নিয়ে আওয়ামীলীগের পক্ষ নিয়ে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। সেই বিতর্কের সঙ্গে জুলাই বিপ্লব আন্দোলনে পুলিশ আন্দোলনকারীদের দমন পীড়নে যে ভূমিকা রেখেছে তার ক্ষত এখন পুরো বাহিনী ভয়ে বেড়াচ্ছে। এসব ক্ষত কাটিয়ে উঠে সাধারণ মানুষের আস্থায় ফিরতে ক্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি বড় সুযোগ। আর সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চায় বাহিনী।