মেট্রোপলিটনে হচ্ছে না লটারি, বদলী হবেন আভ্যন্তরীণ
৯০ ভাগ পুরাতনদের রেখে ১০ ভাগ নতুন মুখ
দেশের ৫৫৩ টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) পদায়নের জন্য লটারীর মাধ্যমে নির্বাচিত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়। দু‘এক দিনের মধ্যেই পদায়নের কাজটি শুরু করবে পুলিশ সদর দফতর। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশীল ঘোষণার আগেই থানার ওসিদের রদবদলের কাজটি শেষ করতে চান সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনে দায়িত্ব পালন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য লটারি করে ওসি পদায়নের আগে সৎ, নিরপেক্ষ পরিদর্শকের তালিকা ইউনিট প্রধানদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। তার ওপর ভিত্তি করেই এই লটারী অনুষ্ঠিত হলো।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ও পুলিশ সদর দফতরের একাধিক নির্ভরযোগ্য সুত্র জানায়, গতকাল সোমবার কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে থানার ওসিদের লটারীর মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয়। দিনের শুরু থেকে রাত অবধি এই লটারীর কাজ চলে। এ কাজের সময় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, সিনিয়র সচিব, পুলিশের আইজি, এডিশনাল আইজিপি (প্রশাসন) সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, লটারীর মাধ্যমে নির্বাচিত ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারগন (এসপি) নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। শনিবার থেকেই তারা যোগদান শুরু করেন। বাকীরা গত দুদিনের মধ্যেই যোগদানের কাজটি শেষ করেন। এর আগে সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য লটারি করে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার নির্বাচিত করা হয়। পরে বুধবার প্রজ্ঞাপন জারি করে তাঁদের পদায়ন করা হয়। তবে, রেঞ্জ ডিআইজি, মহানগর পুলিশ কমিশনার ও উপকমিশনারদের বদলির বিষয়েও সিদ্ধান্ত আসছে। তাদের ক্ষেত্রে লটারি হবে কি না, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
মুঠোফোনে জানতে চাইলে পুলিশের এডিশনাল আইজি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন দৈনিক সংগ্রামকে জানান, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত এসপিগন শনিবার থেকেই তাঁদের নতুন কর্মস্থলে যোগদান শুরু করেন।
মুঠোফোনে জানতে চাইলে ঢাকা জেলার নতুন পুলিশ সুপার (এসপি) মো: মিজানুর রহমান শনিবার রাতে দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, নতুন এসপিদের যোগদান শুরু হয়েছে। ওইদিনই নতুন কর্মস্থলে তিনি যোগদান করেছেন বলে জানান মিজানুর।
গত সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য লটারি করে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার নির্বাচিত করা হয়। পরে বুধবার প্রজ্ঞাপন জারি করে তাঁদের পদায়ন করা হয়। এ ছাড়া ওইদিনই পৃথক তিনটি প্রজ্ঞাপনে রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি) কমিশনারের পদে রদবদল ও অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) পদমর্যাদার ৩৩ কর্মকর্তাকে উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর দুই ধাপে সারা দেশে ১৩৬ জন পুলিশ পরিদর্শককে বদলি করে পুলিশ সদর দফতর। বদলির আদেশে বলা হয়েছে, শনিবার বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে। শনিবার থেকে তারা নতুন কর্মস্থলে যোগদান শুরু করেন। বুধবার পুলিশ সদর দফতরের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট শাখার অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) আবদুল্লাহ আল জহির স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি আদেশে এ বদলির মধ্যে একটি আদেশে ৭৩ জন এবং অন্য আদেশে ৬৩ জন পুলিশ পরিদর্শককে বদলি করা হয়েছে। এই বদলীর আদেশের পর পুলিশ সদর দফতরের সংশ্লিষ্ট শাখা সুত্র জানায়, বদলী হওয়া ১৩৬ জন পুলিশ পরিদর্শক পুলিশের যেসব বিভাগে শূন্য পদ আছে, তাদেরকে দিয়ে সেসব পদ পূরণ করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দফতরের একাধিক সুত্র জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পুলিশের মাঠ প্রশাসনে রদবদল শুরু হয়েছে। পুলিশের চারটি স্তরে আসছে নতুন মুখ। রেঞ্জ ডিআইজি, মহানগর কমিশনার, পুলিশ সুপার (এসপি), অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পরিবর্তন করা হচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এসপি পদায়নের জন্য এরই মধ্যে লটারি েেশষে পদায়ন করা হয়েছে। তারা চলতি সপ্তাহেই নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। প্রথমবারের মতো থানার ওসি পদায়নও হয়েছে লটারির মাধ্যমে। এর আগে ‘যোগ্য’ ওসি বাছাই কাজ শুরু করে পুলিশ সদর দফতর। এ জন্য ‘সৎ’, ‘নিরপেক্ষ’ পরিদর্শকের তালিকা ইউনিটপ্রধানদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়।
জানা গেছে, গত সোমবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় লটারি করে নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালনের জন্য ৬৪ জেলার এসপি চূড়ান্ত করা হয়। লটারির মাধ্যমে এসপি হিসেবে চূড়ান্ত হয়ে যারা পদায়ন হয়েছেন, তাদের এক-চতুর্থাংশই নতুন মুখ। বাকিরা বিভিন্ন জেলায় এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে লটারির মাধ্যমে তাদের জেলা পরিবর্তন হয়েছে।
পুলিশ সদরদপ্তর সূত্র জানায়, যমুনায় লটারির সময় উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সারা দেশে থানার সংখ্যা ৬৩৯ টি। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে থানার সংখ্যা ৫২৮, মেট্রোপলিটন এলাকায় ১১০ ও রেলওয়ে পুলিশের থানার সংখ্যা ২৪। এর মধ্যে রেঞ্জ এলাকাধীন ৫২৯ থানা ও রেলওয়ের ২৪ থানাসহ ৫৫৩ টি থানার ওসি পদায়নের জন্য লটারী করে নির্বাচিত করা হয়েছে। মেট্রোপলিটন এলাকার ১১০ টি থানার ক্ষেত্রে লটারী হবেনা বলে জানায় সুত্রটি। সুত্র মতে, মেট্রোপলিটন এলাকায় আভ্যন্তরীনভাবে ওসি পদায়নের কাজটি করবেন সংশ্লিষ্ট কমিশনারগন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সুত্রটি জানায়, সারাদেশে ওসি পদায়নের ক্ষেত্রে ৯০ ভাগই থাকবেন পুরাতন, যারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন থানায় কর্মরত। আর বাকী ১০ ভাগ আসবেন নতুন মুখ। এই নতুন মুখগুলো বাছাইয়ের আগে সারাদেশে কর্মরত পরিদর্শকদের মধ্য থেকে ১০ ভাগ ‘আনফিট’ পরিদর্শকদের একটি তালিকা করে তাদেরকে নিজ নিজ কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সুত্র জানায়, থানায় ওসিদের পদায়নের ক্ষেত্রে নিজ জেলা ও শ্বশুরের জেলা বাদ দিয়ে কাছাকাছি জেলা ও থানায় বদলী করা হবে। বর্তমানে কর্মরত জেলায় বা থানায় যারা আছেন, তাদের পাশের কিংবা নিকটবর্তী জেলা ও থানায় বদলী করা হলে অপরাধের ধরন ও সংস্কৃতি বুঝে উঠতে ওসিদের বেগ পেতে হবেনা বলে সুত্রটির দাবী। কারন হিসেবে সুত্রটি জানায়, আশপাশের জেলার ব্যাপারে সবারই কমবেশি চেনাজানা থাকে। এছাড়া, সবাই কমবেশি খোঁজ খবরও রাখেন। এছাড়া, ওসিদের দূরে বদলী করা হবেনা পারিবারিক কারনে। কারন হিসেবে সুত্রটি বলছে, দূরে বদলী করা হলে পরিবারের প্রতি টান থেকে কর্মস্পৃহা কমে যাবে। টেনশনে থাকবে পরিবার পরিজন নিয়ে। এটা নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যঘাত ঘটাতে পারে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচন ঘিরে গুরুত্ব বিবেচনা করে ৬৪ জেলাকে এ, বি, সি- তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ‘এ’ ক্যাটেগরিতে রয়েছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেট, বরিশাল, যশোর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, দিনাজপুর জেলা। বাকি জেলাগুলো ‘বি’ এবং ‘সি’ ক্যাটেগরিতে ভাগ করা হয়েছে।