গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানায় ইউরিয়া উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) ও কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো)-তে বুধবার (বিকেল ৩টা) থেকে উৎপাদন স্থগিত করা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে দেশের আরেকটি বড় সার কারখানা শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডে এখনও ইউরিয়া উৎপাদন চালু রয়েছে। যদিও গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতি হলে যেকোনো সময় সেখানেও উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। কারখানা সূত্রে জানা যায়, সিইউএফএল চালু থাকলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন করা সম্ভব। প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়ার বাজারমূল্য প্রায় ৩৮ হাজার টাকা হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি ১৮ লাখ টাকার সার উৎপাদিত হয় এ কারখানায়।

সম্পূর্ণ গ্যাসনির্ভর এ কারখানায় পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন ৪৮ থেকে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংকট ও বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। গত অর্থবছরে সিইউএফএলে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদিত হয়েছে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের বছরে ইউরিয়া সারের চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীন বিভিন্ন কারখানা মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন হয়। বাকি প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে আমদানি করতে হয়।

কারখানার কর্মকর্তারা জানান, গ্যাসনির্ভর এসব কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে যন্ত্রপাতিতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে কেমিক্যাল সঞ্চালন লাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে ত্রুটি সৃষ্টি হয়, ফলে পুনরায় উৎপাদন শুরু করতে সময় লাগে। সিইউএফএল সূত্রে জানা যায়, গত দুই বছর ধরে কখনো যান্ত্রিক ত্রুটি, আবার কখনো গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণে কারখানাটি বারবার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাত্র পাঁচ দিন চালু ছিল এ কারখানা। এছাড়া ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকার পর ১৩ অক্টোবর আবার চালু করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ৩ জানুয়ারি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আবার বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় মেরামতের পর ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে উৎপাদন শুরু হলেও পরবর্তীতে আবার গ্যাস সংকট দেখা দিলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ে।

সর্বশেষ গত ২ মার্চ কারখানাটি পুনরায় চালু করা হলেও গ্যাস সংকটের কারণে বুধবার বিকেলে আবার উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সিইউএফএলের উৎপাদন বিভাগের প্রধান উত্তম চৌধুরী বলেন, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বুধবার বিকেলে কারখানার ইউরিয়া উৎপাদন স্থগিত করা হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে আবার উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৫ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন হয়েছে। এদিকে বন্ধ থাকা অপর কারখানা কাফকোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সিইউএফএল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৭ সালের ২৯ অক্টোবর। জাপানের কারিগরি সহায়তায় চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়া এলাকায় কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে কারখানাটি নির্মাণ করা হয়। প্রতিষ্ঠার সময় দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ১০০ মেট্রিক টন উৎপাদন করা সম্ভব। পাশাপাশি প্রতিদিন প্রায় ৮০০ মেট্রিক টন অ্যামোনিয়া উৎপাদনের সক্ষমতাও রয়েছে এ কারখানার।