আবারো জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের মতো সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সিপিডি। গবেষণা সংস্থাটি মনে করছে, জিনিসপত্রের উচ্চমূল্য, চাকরি হারিয়ে বিপুল মানুষের বেকার হয়ে পড়া, নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায় বৈষম্য বাড়ছে, যাতে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। মূল্যস্ফীতি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতির সমালোচনা করে সিপিডি বলেছে, কেবল নীতি সুদ হার বাড়িয়ে কাজ হবে না। নির্বাচিত সরকার না আসলে অর্থনীতিতেও গতি ফিরবে না বলে মনে করছেন তারা।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৫-২৬: নির্বাচনি বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং গবেষণা ফেলো ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা আসন্ন নির্বাচনকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সহিংসতামুক্ত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
সিপিডি বলছে, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটির মতে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বিদেশি বিনিয়োগ সবগুলোই বর্তমানে গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতের আমূল সংস্কার ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকেও অব্যাহত রাখার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
ড. ফাহমিদা খাতুন তার মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করেন যে, দেশে অর্থনৈতিক গতি বর্তমানে অত্যন্ত মন্থর। বিশেষ করে বিনিয়োগের খরা কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, “বিনিয়োগ কমে যাওয়াই এখন অর্থনীতির প্রধান সমস্যা। বিনিয়োগ না বাড়লে বেকারত্ব বাড়বে এবং জনমনে অস্বস্তি তৈরি হবে।
ব্যাংক খাতের অব্যবস্থাপনা দূর করতে কঠোর পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে প্রয়োজনে দুর্বল ব্যাংক একীভূত বা বন্ধ করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণ কমাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
মূল্যস্ফীতি এখন একটি ‘কাঠামোগত সমস্যা’ হিসেবে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে সিপিডি জানায়, কেবল সুদের হার বাড়িয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম কমলেও দেশের কেন কমছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ড. ফাহমিদা। তিনি সিন্ডিকেট বা মজুতদারি বন্ধের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
রাজস্ব বাড়াতে অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় বন্ধ এবং অর্থপাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জ্বালানি খাতের ব্যয় কমাতে অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে নজর দেওয়ার তাগিদ দেয় সংস্থাটি।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিনিয়োগ না বাড়লে বৈষম্য ও অস্থিরতা বাড়বে। তিনি বলেন, সমাজে যদি ন্যায়সংগত সুযোগ না থাকে, তাহলে একদিকে বৈষম্য তৈরি হয়, অন্যদিকে অস্থিরতা দেখা দেয়।
উদাহরণ দিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে আন্দোলন হয়, তার পেছনেও এই বাস্তবতা কাজ করেছে। বাজারে চাকরি নেই, সরকারি চাকরিই একমাত্র ভরসা, সেখানেও কোটাসংকট। এর সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্চ মূল্যস্ফীতি। সব মিলিয়ে মানুষের জীবনে প্রবল অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছিল।
ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ‘এ বাস্তবতায় অর্থনীতিতে যে বিনিয়োগের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে আমরা যদি বেরোতে না পারি, তাহলে এই সমস্যাগুলো জিইয়ে থাকবে।’
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো উদ্যমী তরুণ জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ জাতি হিসেবে এখনো তরুণÍমানুষের গড় বয়স মাত্র ২৬ থেকে ২৭ বছর। এই তরুণদের যদি আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি, তাহলেই অর্থনীতিতে গতি ফিরবে।’
ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, ‘আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে প্রযুক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি আছে তরুণদের।’
নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘নির্বাচন পরিচালনা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। আমরা চাই, আগামী নির্বাচন নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হোক। অর্থের অপব্যবহার যেন না হয়, সে জন্য নীতিমালা আছে; প্রত্যেক প্রার্থীকে তা মানতে হবে। নির্বাচনে টাকার ছড়াছড়ি যেন না হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচন যেন সহিংসতামুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়, যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট দিতে পারেন। আমরা এমন নির্বাচন দেখতে চাই বলে মন্তব্য করেন ফাহমিদা খাতুন।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ছে। জাতীয় বাজেটের প্রধান খাত এখন ঋণের সুদ পরিশোধ। এই চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তাই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়তে পারে, এমন ঝুঁকি আছে।