আবাসিকে চরম গ্যাস সংকটের সুযোগে বাজারে এলপি গ্যাসের দামে অস্বাভাবিক হারে বেশি টাকা আদায় করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারণ করলেও রাজধানীর বাজারে এর প্রতিফলন নেই। উল্টো নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে প্রতি সিলিন্ডার এলপিজি ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। যদিও ভোক্তাদের সবসময়ই নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বাড়তি খরচ করতে হয়। তবে, এবারের মূল্যবৃদ্ধি পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। চড়া দামের পাশাপাশি বাজারের বিভিন্ন স্থানে এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সংকটও দেখা দিয়েছে।

এলপি গ্যাস বিক্রেতাদের একটি সূত্র জানিয়েছে , শীতকালে স্বাভাবিকভাবে এলপিজির চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সেই তুলনায় বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। চাহিদা ও জোগানের এই অসামঞ্জস্যের সুযোগ নিয়ে খুচরা পর্যায়ে দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

সূত্র জানায়, রাজধানীর প্রায় সব এলাকায় এখন সিলিন্ডার গ্যাসের উচ্চমূল্য ও সংকটের একই চিত্র। মূলত যাদের বাড়িতে পাইপলাইনে গ্যাসের সংযোগ নেই, তারাই এলপিজির প্রধান গ্রাহক। রান্নাবান্নাসহ প্রতিদিনের জরুরি প্রয়োজনে এই গ্যাসের বিকল্প না থাকায়, বাধ্য হয়ে হাজার-হাজার পরিবারকে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০-৬০০ টাকা বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পরিবেশক (ডিস্ট্রিবিউশন) পর্যায় থেকে বর্তমানে এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ খুবই সামান্য। এ ছাড়া পাইকারি পর্যায়ে বাড়তি দামে পণ্যটি কিনতে হচ্ছে বলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।

রাজধানীর সেগুন বাগিচার বাসিন্দা আব্বাস হোসেন বুধবার দৈনিক সংগ্রামকে জানান, ১২ কেজি সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত দাম এক হাজার ২৫৩ টাকা। পরিবহন খরচ মিলিয়ে বড়জোর ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি হতে পারে। কিন্তু এ মাসে আমাকে এক হাজার ৭০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে।

একই এলাকার বাসিন্দা নাজমুল আলম দৈনিক সংগ্রামকে জানান, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার এক হাজার ৮০০ টাকায় দিয়ে ক্রয় করেছেন। তিনি জানান, এর চেয়ে কম দামে কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আগে দেখা যেত কিছু কিছু কোম্পানি তুলনামূলক কম দামে গ্যাস দিত, কিন্তু এখন সবারই এক দাম। দামের চেয়েও বড় সমস্যা হলো, অনেক দোকানে এখন সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।

যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম দৈনিক সংগ্রামকে জানান, সময়মতো সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আজ অর্ডার দিলে কয়েকদিন পর সরবরাহ পাওয়া যায়। সরকারি দাম এক হাজার ২৫৩ টাকা হলেও পাইকারি পর্যায়ে কিনতে হচ্ছে এক হাজার ৫০০ টাকারও বেশি দামে। সরকারি রেট ১৫০০, দোকানে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত রাখা ‘রীতিমতো ডাকাতি’ বলেছেন এ গ্রাহক।

সূত্র জানায়, দেশের এলপিজি চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করে থাকে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। এলপিজি আমদানি ও বিপণনের জন্য বর্তমানে ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স থাকলেও বাজারে সক্রিয় রয়েছে মাত্র ২৮টির মতো কোম্পানি। এর মধ্যে বসুন্ধরা, যমুনা, বেক্সিমকো, মেঘনা (ফ্রেশ), ওমেরা ও বিএম এলপিজি উল্লেখযোগ্য।

এলপিজি সংকটের বিষয়ে কথা হয় ফ্রেশ এলপি গ্যাসের এরিয়া সেলস ম্যানেজার মো. আফজাল হোসেনের সাথে। তিনি জানান, এলপিজি মূলত আমদানিনির্ভর একটি পণ্য। সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি কমে যাওয়ার কারণে বাজারে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক কোম্পানির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। মূলত এলসি জটিলতার কারণে সাপ্লাই চেইনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যার ফলে সার্বিকভাবে এলপিজি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তবে আমরা আশা করছি, দ্রুত সংকট কেটে যাবে।

এলপিজির একজন পরিবেশক জানান, বেশ কিছু কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউশন বর্তমানে প্রায় বন্ধ রয়েছে। আর যাদের সরবরাহ চালু আছে, তারাও চাহিদার তুলনায় অনেক কম গ্যাস দিচ্ছে। সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে কোম্পানিগুলো এলসি জটিলতার কথা বলছে। সময়মতো এলসি খুলতে না পারায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এলপিজি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না বলে তারা জানাচ্ছেন।

মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে তিনি আরও বলেন, কোম্পানিগুলো প্রতিটি সিলিন্ডারে নির্ধারিত দামের চেয়ে অন্তত ২২০ টাকা করে বেশি রাখছে। পরিবেশক হিসেবে তাদের কাছ থেকে বাড়তি দামেই কিনতে বাধ্য হচ্ছি, যার প্রভাব সরাসরি খুচরা বাজার ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়ছে।

বাড়তি মূল্য নিয়ে এলপিজি’র পরিবেশক আমীর হোসেন জানান, আমরা এখন পাইকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছি না। কোম্পানিগুলো নাকি সাপ্লাই কমিয়ে দিয়েছে। এমনকি বিইআরসি ডিসেম্বর মাসের নতুন দাম ঘোষণা করার পর সরবরাহ আরও কমে গেছে। শীত মৌসুমে গ্যাসের চাহিদা বাড়ে, কিন্তু সেই তুলনায় সরবরাহ না থাকায় বাজারে এমন তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

আরেকজন পরিবেশক বলেন, ডিস্ট্রিবিউশন থেকে আমাদের প্রতিটি ১২ কেজির সিলিন্ডার এক হাজার ৫২০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে আরও প্রায় ৮০ টাকা খরচ পড়ে। ফলে সবমিলিয়ে এক হাজার ৭০০ টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। সামনে দাম ও সংকটের মাত্রা আরও বাড়তে পারে।

বিইআরসি’র একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছেন। ট্রেডার পর্যায় থেকে শিপমেন্ট আটকে থাকার কারণে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে বলে কোম্পানিগুলো তাদের জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও কথা বলেছি। তারা জানিয়েছে, এলসি খোলা হলেও ট্রেডার পর্যায় থেকে এলপিজির শিপমেন্ট আটকে আছে। কেন আটকে আছে এবং কীভাবে এর দ্রুত সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করছি।

ক্যাবের জ¦ালানি উপদেস্টা শামসুল আলম জানান , এলপি গ্যাসের পুরো বাজার বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সরকারি তদারকি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিইআরসি’র উচিত কঠোরভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা এবং এলসি সংক্রান্ত কোনো সমস্যা থাকলে দ্রুত সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করে তার সমাধান করা।

এলসি জটিলতা বা অন্য যেকোনো সমস্যাই হোক না কেন, সরকারকে এখানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এটি মূলত এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মাথাব্যথা হওয়া উচিত। কারণ তারা ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে।