প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে নিষিদ্ধ আ’লীগ---- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ছয় জেলায় সেনাবাহিনী ও পাঁচ জেলায় বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। ছয় জেলায় সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কমিশনড কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দিয়েছে সরকার। গতকাল সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা, গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকা, নারায়ণগঞ্জ জেলা, গোপালগঞ্জ জেলা এবং ফরিদপুর জেলায় ২২ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত এ আদেশ কার্যকর থাকবে। এতে বলা হয়, ‘ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮’-এর ১২(১) ও ১৭ ধারা অনুযায়ী এসব এলাকা ও এ সময়ের জন্য এই কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা অর্পণ করা হলো। কোস্টগার্ড ও বিজিবিতে প্রেষণে নিয়োজিত সমপদমর্যাদার কর্মকর্তারাও এ ক্ষমতার আওতাভুক্ত হবেন। প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ধারা ৬৪, ৬৫, ৮৩, ৮৪, ৮৬, ৯৫(২), ১০০, ১০৫, ১০৭, ১০৯, ১১০, ১২৬, ১২৭, ১২৮, ১৩০, ১৩৩ এবং ১৪২ অনুযায়ী অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে এ ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন তারা। এর আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে তিন মহানগর এলাকা ও তিন জেলায় সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ বিষয়ে সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারকে চিঠি দেওয়া হয়।
৫ জেলায় বিজিবি মোতায়েন
এদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের পাঁচ জেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো- কক্সবাজার, মাদারীপুর, শেরপুর, গাজীপুর ও মৌলভীবাজার। গতকাল সোমবার রাতে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কক্সবাজার, মাদারীপুর, শেরপুর, গাজীপুর ও মৌলভীবাজার জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে আজ সোমবার সন্ধ্যা থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া দেশের অন্য জেলাগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে মোতায়েনের লক্ষ্যে বিজিবি সদস্যরা স্ট্যান্ডবাই থাকবে। বিজিবি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।
সচিবালয়ে যা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে ২৩ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এক প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন তিনি। মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে ছয় জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কোনো নাশকতার আশঙ্কা আছে কি না- জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। কিন্তু শৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে এবং আমাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হয়।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ যে মাফিয়া বাহিনী আওয়ামী লীগের কিছু অপতৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় আমরা দেখেছি, তারা মিছিল-মিটিং করার মতো কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, দু-একটা জায়গায় দেখেছি। তাতে আমাদের মনে হয়েছে, তারা হয়তো একটা অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করলেও করতে পারে। এ বিবেচনায় আমরা আমাদের সব বাহিনীকে সতর্ক থাকার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি, যা সবসময় থাকে। তিনি বলেন, এর বাইরে আমরা আজ থেকে ৩০ তারিখ (জুন) পর্যন্ত আমাদের সেনা সদস্যদের আবার ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার আইন মোতাবেক ঢাকা মেট্রো, চট্টগ্রাম মেট্রো, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর মেট্রো এবং এর বাইরে দুটো জেলা, তাতে আমরা (সেনাবাহিনী) ডেপ্লয় (মোতায়েন) করেছি, যাতে যে কোনো রকমের অপতৎপরতা অ্যাড্রেস করা যায়, ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার। পুলিশের প্রতি যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, সেখানে সেনাবাহিনী তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়, আবার ছয় জেলায় সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত- এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখানে আস্থা-অনাস্থার প্রশ্ন আসে কেন? আমাদের পুলিশ বাহিনী যে সমস্ত কৃতিত্বপূর্ণ কার্যক্রম করেছে, অ্যাচিভমেন্ট আছে, সবগুলো যেন আমরা পুরস্কৃত করেছি। দুই-একটা জায়গায় যেখানে একটু শৃঙ্খলাপন্থী কর্মকাণ্ড করেছে, তাদেরকে আমরা পানিশ করেছি। এখানে আস্থাহীনতার তো কোনো বিষয় নেই। আমরা সবসময় প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার, মাঝে মধ্যে বিজিবিকে আনি, মাঝে মধ্যে সেনা সদস্যদেরকে আমরা নিয়োগ করি, দিস ইজ আ রুটিন ওয়ার্ক। পুলিশ কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারছে না- এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ১৫ জুন সারা বাংলাদেশ থেকে সেনা সদস্যদের প্রত্যাহার করা হয়েছে, যারা দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর যাবৎ মাঠে ছিল, ইনটেরিম গভর্নমেন্টের সময় ছিল। কিন্তু আমরা নির্বাচিত সরকারে আসার পরে আমরা যত শীঘ্রই সম্ভব তাদেরকে মাঠ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু এখন যেটা আমরা কয়েকটা জায়গায় ডেপ্লয় করতে যাচ্ছি, সেটার সাথে ওই পরিস্থিতির কোনো মিল নাই, এটা ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার। এ ছয় জেলায় সেনাবাহিনী পুলিশকে সহযোগিতা করবে বলেও জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।
অন্য জায়গায় কি তাহলে কোনো ধরনের আশঙ্কা নেই? এ বিষয়ে তিনি বলেন, না না, আমরা মনে করেছি কোনো কোনো জায়গায় তাদের অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টের ভিত্তিতে আমরা সেটা করছি। এটা শুধু নয়, আরও কিছু বিষয় আছে, আমি এখানে এগুলো ফাঁস করতে চাই না। দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য কিছু কিছু মহল, কোনো কোনো মহল অপতৎপরতায় লিপ্ত আছে। তো সেজন্য আমরা অ্যালার্ট থাকার অংশ হিসেবে। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপির একজন ছেলেকে নিয়ে আসা হয়েছিল, জিজ্ঞাসাবাদ করে মুচলেকা দিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আসলে মেসেজটা কী, তাকে কী অভিযোগে আনা হয়েছিল, পুলিশ ছেড়েই বা দিল কেন? এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপির ছেলের কি কোনো বিশেষ অধিকার আছে? আইনের চোখে সবাই সমান। পুলিশের কাছে বিভিন্ন রকমের অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে, সেগুলোর জন্য জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে তারা নিয়ে এসেছে, জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং প্রয়োজন মনে করেছে তার কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়ার, প্রয়োজন মনে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।
পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ এসেছিলেন। একজন সনাতন ধর্মের নারী তাদের জন্য আলাদা প্রদেশ চাচ্ছেন, এটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে- এ বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ আমার সাথে সাক্ষাৎ করার, সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য বেশ কিছুদিন আগেই তারা সময় চেয়েছিল। আমি এতদিন সময় দিতে পারিনি, আজকে সময় দিয়েছি। তাদের অনেক বিষয়ে কথা আছে। আমাদের দেশের যারা হিন্দু ভাইবোন, তাদের পক্ষ থেকে তাদের অনেক দাবি-দাওয়া আছে, বিভিন্ন বিষয়ে, সেগুলো নিয়ে তারা কথা বলেছে। আমরা সহযোগিতা চেয়েছি আমাদের যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহাল থাকে, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকি, সেভাবে যেন সবাই কাজ করে। এর মধ্যে প্রসঙ্গক্রমে একজন ভদ্রমহিলা যিনি আলাদা প্রদেশ চেয়েছেন বললেন, সে প্রসঙ্গটাও এসেছে। হয়তো তার স্লিপ অব টাং হতে পারে বা হয়তো অনেকেই অনেক সময় বক্তৃতা দেওয়ার সময় অতি উৎসাহে অনেক কিছু বলে ফেলেন। মন্ত্রী বলেন, সত্যিকারের ডাটা, তথ্য, রিপোর্ট সবকিছু বিশ্লেষণ করে দেখুন, বিগত যে কোনো সময়ের তুলনায়, অন্যান্য বছর এবং মাসওয়ারি অপরাধ চিত্র আমাদের এই সময়ে অনেক কম। তিনি বলেন, বিরোধীদল ১১ দলের ব্যানারে সমাবেশ করছে, গণতন্ত্র বিকশিত হচ্ছে। তারা তাদের কথা বলবে, দে আর অ্যাট লিবার্টি। আমরাও আমাদের কথা মাঠে বলব।