বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান আশা প্রকাশ করে বলেছেন, এবারের সংসদের মাধ্যমে সব ধরণের অন্যায়-অসঙ্গতির অবসান ঘটবে। তিনি বলেন, সংসদীয় আলোচনায় ব্যক্তিগত আক্রমণ বা চরিত্র হননের পরিবর্তে জনগণের কল্যাণমূলক বিষয়গুলোকে প্রাধান্য পাওয়া উচিত। অতীতের অনেক সংসদে এ সব কারণে সময় অপচয় হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বক্তব্যের শুরুতে জামায়াতের আমীর বলেন, অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে এই সংসদ। আমরা চাই এই সংসদ যেন কারো চরিত্র হননের ক্ষেত্র না হয়। জাতীয় সংসদে শুভেচ্ছা বক্তব্যে তিনি বলেন, বর্তমান সংসদ সাধারণ কোনো সংসদ নয়, বরং এটি অনেক ত্যাগ ও রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত একটি সংসদ। বক্তব্যের শুরুতে তিনি দেশের বিভিন্ন আন্দোলন ও সময়ের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট আমলে যারা নির্যাতনের শিকার হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন কিংবা আয়নাঘরের বন্দি হয়েছেন তাদের সবার প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাই। বিশেষভাবে ২৪-এর জুলাইয়ে যারা বুক চিতিয়ে লড়াই করে আজকের এই সংসদ গঠনের সুযোগ করে দিয়েছেন, তাদের স্মরণ করছি।

শহীদদের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, যারা শহীদ হয়েছেন আল্লাহ যেন তাদের শহীদের মর্যাদা দান করেন এবং যারা আহত বা পঙ্গু হয়েছেন তাদের দ্রুত সুস্থতা দান করেন। এ সময় তিনি নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, আজ আপনি মহান সংসদের স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং আপনার সঙ্গে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে কামাল সাহেব (ব্যারিস্টার কায়সার কামাল) নির্বাচিত হয়েছেন। আমরা দুজনকেই আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষভাবে সংসদ পরিচালনা করবেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আপনি একটি দল থেকে নির্বাচিত হয়ে সংসদে এলেও ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে আপনি দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। এখন আমরা মনে করি আপনার কাছে সরকারি দল ও বিরোধী দল আলাদা কিছু হবে না। আমরা আপনার কাছে সুবিচার পাবো।

তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর ৫৫ বছর অতিক্রম করলেও দেশের সংসদীয় রাজনীতি সবসময় কার্যকর ছিল না। অনেকসময় ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে সংসদ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তবে বর্তমান সংসদকে তিনি গতানুগতিক ধারার বাইরে একটি কার্যকর ও গতিশীল সংসদ হিসেবে দেখতে চান। সংসদের অতীত কার্যক্রমের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অনেক সময় দেশের মানুষের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা না হয়ে ব্যক্তিগত চরিত্র হননের রাজনীতি হয়েছে।

তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, এই সংসদ যেন কারও চরিত্র হননের কেন্দ্রে পরিণত না হয়। এখানে যেন জনকল্যাণের বিষয়গুলোই অগ্রাধিকার পায়। এ সময় তিনি তরুণ সংসদ সদস্যদের উপস্থিতির বিষয়টিও উল্লেখ করেন। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বর্তমান সংসদে অনেক তরুণ সদস্য রয়েছেন এবং তাদের কাছ থেকে গঠনমূলক রাজনীতি ও ইতিবাচক উদ্যোগ আশা করা যায়।

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সংসদের মাধ্যমে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সব ধরনের অন্যায়-অসঙ্গতির অবসান ঘটবে। এবারের সংসদে অনেক তরুণ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং তারা অতীতে দায়িত্ব পালনকারী অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারবেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদীয় আলোচনায় ব্যক্তিগত আক্রমণ বা চরিত্র হননের পরিবর্তে জনগণের কল্যাণমূলক বিষয়গুলোকে প্রাধান্য পাওয়া উচিত। অতীতের অনেক সংসদে এ সব কারণে সময় অপচয় হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সংসদ কখনোই ব্যক্তিকে হেয় করার স্থান হওয়া উচিত নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জামায়াত নেতা সংসদ পরিচালনায় স্পিকারকে তার দলের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, সংসদ রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান স্তম্ভের একটি। এটি সঠিকভাবে পরিচালিত হলে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও সেভাবেই কাজ করবে। জুলাই আন্দোলনের প্রত্যাশার কথা স্মরণ করে শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের প্রধান দাবি ছিল ন্যায়বিচার।

‘আমরা ন্যায়বিচার চাই’Ñ এ কথা উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অন্যায়ের অবসান ঘটাতে সংসদ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে। শেষে তিনি স্পিকারের সুস্বাস্থ্য ও সংসদ কার্যকরভাবে পরিচালনায় তার সফলতা কামনা করেন।

রাষ্ট্রপতির তিন অপরাধ :

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ বর্জন করেছে বিরোধী দল। রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জনের কারণ হিসেবে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির তিন অপরাধে তার ভাষণ বর্জন করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির ভাষণের শুরুতেই বিরোধী দলের তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। একপর্যায়ে বিরোধী দলের সদস্যরা অধিবেশন থেকে ওয়াক আউট করেন।

প্রথা অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি। ওয়াক আউট শেষে সংসদে সাংবাদিকদের সামনে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই সংসদ জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা অনুরোধ করেছিলাম, এই সংসদে ফ্যাসিস্টের দোসর, খুনির কোনো দোসর যেন বক্তব্য রাখতে না পারে।’

রাষ্ট্রপতি তিনটি অপরাধে অপরাধী বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াত আমীর। তিনি বলেন, ‘এই প্রেসিডেন্ট তিনটা কারণে অপরাধী। তার বক্তব্য এই মহান সংসদে আমরা শুনতে পারি না। প্রথম কারণ, তিনি সব খুনের সহযোগী ছিলেন। দ্বিতীয়ত, ২০২৪ সালের আগস্টের ৫ তারিখ তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি তা অস্বীকার করেছেন। তিনি জাতির সামনে মিথ্যাবাদী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছেন।

তৃতীয় কারণ হিসেবে জামায়াত আমীর বলেন, রাষ্ট্রপতি নিজের হাতে অর্ডিন্যান্স স্বাক্ষর করেছেন। নির্বাচনে দুটি ভোট হবে, এতে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবেন তারা সংস্কার সংশোধন পরিষদের সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হবেন। একই দিনে উভয় শপথ একই ব্যক্তি পড়াবেন। এই শপথ দুটি আমরা নিলেও সরকারি দল নেয়নি।

রাষ্ট্রপতির প্রথম দায়িত্ব ছিল অধ্যাদেশ জারির ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা। তিনি সেই অধিবেশন ডাকেননি। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি এই ৭০ শতাংশ মানুষকে অপমান করেছেন। এখানেও তিনি অপরাধ করেছেন।