মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম (বান্দরবান) : বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং পাহাড়ের প্রাকৃতিক উৎস ‘ঝিরি-ঝরনা’গুলো শুকিয়ে যাওয়ায় দুই উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার লক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। একদিকে পানযোগ্য পানির অভাব, অন্যদিকে দৈনন্দিন ব্যবহারের পানির সংকটে হুমকির মুখে পড়েছে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য।

সংকটের মূলে বন উজাড় ও পাথর উত্তোলন : স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগীদের মতে, এই সংকটের পেছনে প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে মানবসৃষ্ট কারণই বেশি দায়ী। আলীকদমের চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, “পাহাড়ের প্রাকৃতিক পানির আধার হিসেবে পরিচিত ঝিরি-ঝরনাগুলো থেকে অবাধে পাথর উত্তোলন এবং নির্বিচারে বন উজাড়ের ফলে প্রকৃতি পানি ধরে রাখার ক্ষমতা হারিয়েছে।”

এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে যাওয়ায় অধিকাংশ টিউবওয়েল ও রিংওয়েল অকেজো হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঠিক তদারকির অভাবে ঠিকাদাররা শুষ্ক মৌসুমে কাজ না করে বর্ষায় তড়িঘড়ি করে টিউবওয়েল স্থাপন করেন। ফলে অল্প গভীরতায় পানি পাওয়া গেলেও মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত সেগুলো থেকে আর পানি মেলে না।

সরেজমিন দেখা গেছে, লামা উপজেলার সদর ইউনিয়নের মধুঝিরি, নুনারঝিরি, চম্পট পাড়া এবং গজালিয়া, ফাঁসিয়াখালী, আজিজনগর, সরই, রূপসীপাড়া ও ফাইতং ইউনিয়নে পানির অভাব সবচেয়ে প্রকট। একই চিত্র আলীকদম উপজেলার সদর, চৈক্ষ্যং, নয়াপাড়া ও দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে। এখানকার গয়াম ঝিরি, রোয়ম্ভু খাল, পানির ঝিরি ও মাতামুহুরী নদীর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা এখন সম্পূর্ণ পানিশূন্য।

কুরুকপাতা ইউপি চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো জানান, প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে এই ইউনিয়নে পানির হাহাকার দেখা দেয়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক রিংওয়েল বা টিউবওয়েল না থাকায় বাসিন্দারা ঝিরির বালু খুঁড়ে ছোট ছোট ‘কুয়া’ বা কূপ বানিয়ে সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন। আলীকদমের আমতলী এলাকার বাসিন্দা ওয়াধন তঞ্চঙ্গ্যা আক্ষেপ করে বলেন, “পাহাড়ে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের অনেক প্রকল্পের কথা শোনা গেলেও আমাদের এলাকায় এখনো তার সুফল পৌঁছায়নি।”

মানুষ ও বন্যপ্রাণীর এক আধার: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পাড়াবাসীরা : পানির এই তীব্র সংকটে শুধু মানুষ নয়, চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বন্যপ্রাণী ও জলজ প্রাণীরাও। আলীকদমের জানালী পাড়ার বাসিন্দা সিংলো ম্রো জানান, তাঁদের পাড়ার বাসিন্দারা পাহাড়ের একটি উন্মুক্ত ঝিরি বা ছড়া থেকে প্রাত্যহিক ব্যবহারের পানি সংগ্রহ করেন। কিন্তু বর্তমানে বনাঞ্চলে পানির অন্যান্য উৎস শুকিয়ে যাওয়ায় তৃষ্ণার্ত বন্যপ্রাণীরাও ওই একই ঝিরিতে নেমে আসছে। এতে একদিকে যেমন বন্যপ্রাণীর জীবন বিপন্ন হচ্ছে, অন্যদিকে পশুপাখির সংস্পর্শে আসা ওই উন্মুক্ত জলাধারের পানির বিশুদ্ধতা ও জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিয়ে পাড়াবাসীদের মধ্যে গভীর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রকল্পের ধীরগতি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : আলীকদম উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন জানান, ‘উপজেলা সদরে পানি শোধনাগার প্রকল্প’-এর মাধ্যমে গত বছর থেকে ২৫০ পরিবারের মাঝে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে পানবাজার, উত্তর পালং পাড়া, পূর্ব পালং পাড়া ও পাহাড়তলী পাড়াসহ পার্শ্ববর্তী সংকটপ্রবণ এলাকায় সরবরাহ লাইন স্থাপনের কাজ চলছে। এই কাজ সম্পন্ন হলে উপজেলা সদর এলাকায় পানি সংকট কমে যাবে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ ঠিকাদার ও কর্তৃপক্ষের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে এই প্রকল্পের কাজ শম্ভুক গতিতে চলছে। অন্যদিকে, লামা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, লামা পৌরসভায় ১৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বৃহৎ পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে, যা সম্পন্ন হলে দুর্ভোগ অনেকটা লাঘব হবে।

পার্বত্য অঞ্চলের এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদী পানীয় জল ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক উৎস সংরক্ষণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামীতে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা। বিশেষ করে ঝিরি-ঝরনা থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ এবং বনায়ন নিশ্চিত করার ওপর তারা জোর দিয়েছেন।