চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

এ মামলায় তিনটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। ট্রাইব্যুনালে তাদের এসব অভিযোগ পড়ে শোনান চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। শুনানিতে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নৃশংসতা চালায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় তদন্তের প্রেক্ষিতে ২৮ জনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত সংস্থা। প্রতিবেদনটি যাচাই-বাছাই শেষে গতকাল ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয় ট্রাইব্যুনালে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আসামীদের উসকানি-প্ররোচনা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ উপস্থিতিতে জুলাই আন্দোলনে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর গুলী চালানো হয়। এতে মাহমুদুর রহমান সৈকত, ফারহান ফাইয়াজ, ৯ জন শহীদ হন। আহত হন আরও অনেকে। যার পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে। এছাড়া ৫০ জন সাক্ষী রয়েছেন।

আসামীদের মধ্যে অন্যতম সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

বর্তমানে গ্রেপ্তার রয়েছেন চারজন। তারা হলেন- নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখা সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহ-সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, ওমর ফারুক ও ফজলে রাব্বি।

অভিযোগ পড়া শেষে আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেওয়ার আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর। পরে অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া পলাতক আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আগামী ২৯ জানুয়ারি হাজিরের দিন ধার্য করা হয়েছে।

ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে

অভিযোগ গঠনের আদেশ ২২ জানুয়ারি

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশের জন্য আগামী ২২ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

গতকাল রোববার বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। অপর সদস্যরা হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

ট্রাইব্যুনালে গতকাল প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। শুনানিতে তারা আসামীদের ব্যক্তিগত দায় তুলে ধরেন। এর মধ্যে ওবায়দুল কাদেরের তিনটি অভিযোগ পড়া হয়। এছাড়া সবার বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টে আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আবেদন করেন প্রসিকিউশন।

পরে পলাতক আসামীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী লোকমান হাওলাদার ও ইশরাত জাহান। এ মামলায় আনা অভিযোগের সঙ্গে তাদের মক্কেলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তারা। একইসঙ্গে যথাযথ তথ্যপ্রমাণ না থাকায় চার্জ গঠন না করাসহ অব্যাহতির প্রার্থনা করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে এ বিষয়ে আদেশের জন্য ২২ জানুয়ারি দিন নির্ধারণ করেন আদালত।

পলাতক অপর আসামীরা হলেন- আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।

এর আগে, গত ৮ জানুয়ারি পলাতক আসামীদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী নিয়োগ দেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন সাত আসামীরই আত্মসমর্পণের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু তারা হাজির হননি। এছাড়া পরোয়ানা জারির পর ২৯ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার করে তাদের ট্রাইব্যুনালে আনার কথা ছিল। তবে স্থায়ী-অস্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে কাউকে খুঁজে পায়নি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। পরে ৩০ ডিসেম্বর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধে ১৮ ডিসেম্বর আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-২। একই দিন সকালে ফরমাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, জুলাই-আগস্টের প্রত্যেক শহীদের নিজস্ব গল্প ও মহাকাব্যিক উপাখ্যান রয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালীন ১৮ ও ১৯ জুলাই দেশের ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত দিন। এই দুদিনে হত্যাকা-ের অন্যতম হটস্পট ছিল মোহাম্মদপুর এলাকা। এখানে ৯ জনকে হত্যা করা হয়। আহত হন অসংখ্য মানুষ। আত্মত্যাগকারী ৯ শহীদ হলেন ফারহান ফাইয়াজ, মাহমুদুর রহমান সৈকত, রাজু আহমেদ, মাহিন, মোহাম্মদ রনি, আল শাহরিয়ার রোকন, ইসমাইল হোসেন, জসিম উদ্দীন ও জুবাইদ হোসেন ইমন।

তিনি বলেন, এসব শহীদের রক্তের বিনিময়ে আজকের এই বাংলাদেশ। আমাদের অঙ্গীকার ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যারা হত্যাকা- চালিয়েছে, যারা রাজপথে সরাসরি হত্যাকা-ে সংগঠনের ভূমিকা পালন করেছে, যারা পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা বা মাস্টারমাইন্ড ছিলেন, তাদের প্রত্যেককে আমরা বিচারের মুখোমুখি করবো। সেই অঙ্গীকারের ফলশ্রুতিতে আমাদের তদন্ত সংস্থা কাজ করছে। এসব অপরাধীর ব্যাপারে তারা তদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ আদালতে দাখিল করেছেন। আগামী ২৯ জানুয়ারির পর পরবর্তী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচারকাজ শুরু হবে।

শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকত প্রসঙ্গে তাজুল বলেন, খুবই প্রাণবন্ত ছেলে ছিল সৈকত। ফারহান ফাইয়াজও অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল ছিল। আমাদের প্রত্যেক শহীদের একটা নিজস্ব গল্প বা নিজস্ব মহাকাব্যিক উপাখ্যান রয়েছে। সৈকতের উচ্চতা ছয় ফুটের মতো ছিল। ১৯ জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে মা-কে না জানিয়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় আন্দোলনে গিয়েছিল ছেলেটি। চায়না রাইফেল থেকে পুলিশের একটা দল যখন গুলিবর্ষণ শুরু করে, গুলিটা তখন সরাসরি তার কপাল ভেদ করে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলে শাহাদাত বরণ করেন সৈকত।

তিনি আরও বলেন, ফাইয়াজ ও সৈকতের শাহাদাতের ঘটনা ওই সময় ব্যাপক আলোচিত ও আবেগ সৃষ্টি করেছিল। ছাত্র-জনতার এ আন্দোলনকে মারাত্মকভাবে উদ্বেলিত করেছিল। এসব ঘটনা আমরা এখানে বিচারের জন্য উপস্থাপন করেছি। বাংলাদেশের মাটিতে এই নিষ্ঠুরতম হত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করা হবে ইনশাআল্লাহ।