বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী

দেশের এক তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ বর্তমান সময়ে কোনো না কোনো রোগের শিকার। উচ্চ রক্তচাপ থেকে চর্মরোগ পর্যন্ত এরকম নানাপ্রকার অসুখ-বিসুখের সঙ্গে লড়াই করছে মানুষ। এসময় দেড় শতাধিক রোগের কথা জানা যায় যেগুলোর চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নিত্য ভীড় করছেন আক্রান্ত মানুষেরা।

সরকারি হিসেবে বলা হচ্ছে দেশের ৩৬.২৬ শতাংশ মানুষ নানান রোগে আক্রান্ত। অংকের হিসাবে এই আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় সাড়ে ৬ কোটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে এই তথ্যের কথা জানা যায়। দেশের মানুষ যেসব রোগে ভুগছে সেই তালিকায় সবার ওপরে আছে উচ্চ রক্তচাপ। প্রতি ১ হাজার মানুষের মধ্যে ৭৮ দশমিক ২৮ জন এই রোগে আক্রান্ত। বিবিএস জানায়, ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে’ নামের এই জরিপ চালানো হয় গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে। সারা দেশে ৪৭ হাজার ৪০টি খানা (পরিবার) এবং ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৮৬ মানুষের ওপর জরিপ চালানো হয়।

সম্প্রতি এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, জরিপের আগের ৯০ দিনে প্রতি ১ হাজার মানুষের মধ্যে ৩৩২ জন বা ৩৩ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো রোগে ভুগেছেন। ১০টি রোগের তালিকার শীর্ষে ছিল উচ্চ রক্তচাপ। এরপর যথাক্রমে ১ হাজার মানুষের মধ্যে পেপটিক আলসার ৬৩ দশমিক ৭৯ জন, ডায়াবেটিস ৪৩ দশমিক ১৫ জন, বাত বা আর্থ্রাইটিস ৩৯ দশমিক ৭৫ জন, চর্মরোগ ৩৭ দশমিক ২৩ জন, হৃদরোগ ৩১ দশমিক ৩২ জন, হাঁপানি ৩০ দশমিক ৯৪ জন, অস্টিওপরোসিস ২২ দশমিক ৩০ জন, হেপাটাইটিস ২২ দশমিক ৩০ জন এবং ডায়রিয়ায় ১৫ দশমিক ৮৯ জন ভোগেন। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, দেশে সন্তান জন্মদানে অস্ত্রোপচারের (সিজারিয়ান) হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এখন মোট প্রসবের ৪৯ শতাংশই হচ্ছে অস্ত্রোপচারে। এতে খরচের পরিমাণ স্বাভাবিক প্রসবের তুলনায় পাঁচ গুণের বেশি। অপর এক তথ্যে জানা যায়, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৮ হাজার শিশু জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে অন্তত ২০০টি শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্মাচ্ছে। অর্থাৎ বছরে হৃদরোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করা শিশুর সংখ্যা প্রায় ৭৩ হাজার। এ তথ্য কিডস হার্ট ফাউন্ডেশনের। বর্তমানে দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। কিন্তু এতসংখ্যক হৃদরোগী শিশুর চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন হাতেগোনা কয়েকজন। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট এবং হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) দেয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের সংখ্যা মাত্র ৫৩ এবং পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জন আছেন ১৫ জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ।

জরিপে দেখা যায়, মশা প্রতিরোধে ৯৭ শতাংশ মানুষ এখনো মশারি ব্যবহার করে। মশা মারার ইলেকট্রিক ব্যাট বা ম্যাট শহরে গ্রামের তুলনায় ছয়গুণ বেশি ব্যবহৃত হয়। রিফিলার ব্যবহার করেন প্রতি ১০০ জনে ৭৩ জন। জরিপ মতে, সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা নেয়া হয় ওষুধের দোকান বা ডিসপেনসারি থেকে- ৫১ শতাংশ। সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে যায় মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ২০ শতাংশ। চিকিৎসা নিতে গড়ে খরচ ২ হাজার ৪৮৭ টাকা, শহরে এ ব্যয় বেশি। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া নিয়েও ভোগান্তি রয়েছে; প্রতি পাঁচজনে একজনকে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে যেতে ১০ কিলোমিটার বা তার বেশি পথ পাড়ি দিতে হয়। মাত্র ০.৫ শতাংশ পরিবার জেলা হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করে। এদিকে দেশে প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসাকেন্দ্র ও ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করাকে বেশ লাভজনক ব্যবসা বলে মনে করা হয়। স্বাস্থ্য সেক্টরের কর্মকা- এখন আর চ্যারিটি বা দাতব্য কাজের মধ্যে আটকে নেই। নতুন করে স্থাপিত ক্লিনিকগুলো চোখ ধাঁধানো আধুনিক ডিজাইন ও ডেকোরেশনে সমৃদ্ধ। এর জন্য যে বিপুল বিনিয়োগ করা হয় তা উসুল করা হয় রোগীর কাছ থেকে।