সদ্যসমাপ্ত ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কনটেইনার হ্যান্ডলিং, কার্গো পরিবহণ এবং আমদানি-রফতানি পণ্যবোঝাই জাহাজ পরিচালনায় অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়েছে। নানা প্রতিবন্ধকতা ও সংকটের মধ্যেও কনটেইনারে প্রায় ৪ শতাংশ এবং কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি।
বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, শুল্ক কর্মকর্তাদের কর্মবিরতি, পরিবহণ ধর্মঘট, মাশুল বৃদ্ধি নিয়ে মতবিরোধ এবং দেশের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি সত্ত্বেও ‘দৃশ্য ও অদৃশ্য হস্তক্ষেপমুক্ত’ অপারেশন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরবচ্ছিন্ন কর্মতৎপরতা, ব্যবহারকারীদের সহযোগিতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নই এই সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দরে মোট ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। আগের বছর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৭ টিইইউস। ফলে এক বছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৪২ টিইইউস, যার প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ।
একই সময়ে বন্দরে আমদানি-রফতানি কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ মেট্রিক টন, যা ২০২৪ সালের ১২ কোটি ৩৯ লাখ ৮৩ হাজার ১৪ মেট্রিক টন থেকে ১ কোটি ৪১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৯৮ মেট্রিক টন বেশি। এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
জাহাজ হ্যান্ডলিংয়েও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর মোট ৪ হাজার ২৭৩টি আমদানি ও রফতানি জাহাজ পরিচালনা করেছে, যেখানে ২০২৪ সালে ছিল ৩ হাজার ৮৫৭টি। অর্থাৎ এক বছরে জাহাজ হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৪০৬টি, যা ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এর আগে কখনও এক বছরে এতো বেশি কনটেইনার, কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়নি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দর, কমলাপুর কনটেইনার ডিপো ও পানগাঁও নৌ টার্মিনাল মিলিয়ে মোট ৩০ লাখ ৫০ হাজার টিইইউস কনটেইনার পরিবহণ হয়। ২০২২ সালে ছিল ৩১ লাখ ৪২ হাজার ৫০৪, আর ২০২১ সালে ৩২ লাখ ১৪ হাজার টিইইউস। তারও আগে ২০২০ সালে ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৯৭৭, ২০১৯ সালে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার ১৮৭, ২০১৮ সালে ২৯ লাখ ৩ হাজার ৯৯৬ এবং ২০১৭ সালে ২৬ লাখ ৬৭ হাজার ২২৩ কনটেইনার পরিবহণ হয়।
কার্গো পরিবহণের ক্ষেত্রেও ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৩ সালে বন্দরে ১২ কোটি ২ লাখ মেট্রিক টন, ২০২২ সালে ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৬৫ হাজার ৬৮২ মেট্রিক টন এবং ২০২১ সালে ১১ কোটি ৬৬ লাখ মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং হয়। ২০২০ ও ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১০ কোটি ৩২ লাখ ৯ হাজার ও ১০ কোটি ৩০ লাখ ৭৭ হাজার মেট্রিক টন।
জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের দিক থেকে ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে ৪ হাজার ১০৩টি জাহাজ পরিচালিত হয়। এর আগে ২০২২ সালে ৪ হাজার ৩৬১টি, ২০২১ সালে ৪ হাজার ৫৪টি, ২০২০ সালে ৩ হাজার ৭২৮টি এবং ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৮০৭টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং অপারেশনাল সংস্কারের ফলে কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বেসরকারি অপারেটরের পরিবর্তে চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেখানে কনটেইনার হ্যান্ডলিং প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো বন্দরের কার্যক্রমে।
তিনি আরও জানান, বাল্ক কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে এক বছরে ১৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। একই সঙ্গে ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা বাড়ানো, ই-গেট পাস, কনটেইনার ট্র্যাকিং এবং স্বয়ংক্রিয় পেমেন্ট সিস্টেম চালুর ফলে বন্দরের অপারেশন আরও গতিশীল হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, জাহাজ হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ায় বন্দরে জাহাজের ওয়েটিং টাইম বা গড় অবস্থানকাল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর, অক্টোবর এবং নভেম্বর-ডিসেম্বরের বেশ কয়েকদিনে জাহাজের ওয়েটিং টাইম শূন্যে নেমে আসে।