এম এ আর মশিউর
যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল আলমের ঘুষ গ্রহণের ঘটনায় দুদকের হাতে হাতেনাতে আটক, তার বিরুদ্ধে মামলা এবং আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণের ঘটনা জেলায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রমাণসহ একজন সরকারি কর্মকর্তার গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সংস্থার দৃঢ় অবস্থানের প্রতিফলন। তবে এই ঘটনার পর যশোরের শিক্ষা প্রশাসনের একটি অংশের ভূমিকা নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, লক্ষাধিক টাকা ঘুষ গ্রহণের সময় আশরাফুল আলমকে হাতেনাতে আটক করা হয়। তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয় এবং আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সাধারণত এমন ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে সতর্কতা ও আত্মশুদ্ধির বার্তা পৌঁছানোর কথা থাকলেও যশোরে ঘটেছে ভিন্ন চিত্র।
জেলার কয়েকটি উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তারা একযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ওই কর্মকর্তার পক্ষে অবস্থান নেন। অভিযোগ উঠেছে, ভার্চুয়াল মিটিংয়ের মাধ্যমে দূরদূরান্ত থেকে শিক্ষকদের ডেকে এনে মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করানো হয়েছে। এই কর্মসূচির নেতৃত্বে ছিলেন ঝিকরগাছা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার অলিয়ার রহমান। তার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার প্রবীণ কুমার কাঞ্চিলাল,বাঘারপাড়া উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলামসহ অন্যান্য উপজেলার কয়েকজন কর্মকর্তা।
মানববন্ধন ও জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপির মাধ্যমে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে নির্দোষ দাবি করা হয়। অথচ এই কর্মকর্তা ঘুষ গ্রহণের সময় প্রমাণসহ আটক হয়েছেন এ বিষয়টি উপেক্ষা করেই আন্দোলন চালানো হয় বলে অভিযোগ সচেতন মহলের।
একজন মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,আমাদের বলা হয়েছে এটি প্রশাসনিক ষড়যন্ত্র। অফিসের নির্দেশে আমরা এসেছি। না এলে নানাভাবে হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে উপজেলা শিক্ষা অফিসারের দাবি, আমরা ন্যায়বিচার চাই। তবে তারা কীভাবে প্রমাণসহ গ্রেপ্তারের পরও অভিযুক্তের পক্ষে আন্দোলনকে ন্যায়সঙ্গত মনে করছেন সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেননি।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সচেতন অভিভাবকরা। যশোর শহরের এক ছাত্রের অভিভাবক ফসিয়ার রহমান বলেন, যাদের হাতে আমরা আমাদের সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দিতে পাঠাই, সেই শিক্ষক সমাজ যদি ঘুষখোরের পক্ষে দাঁড়ায়, তাহলে শিশুদের কী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে?
একই সুর শোনা গেছে সুধীজনদের কণ্ঠেও। এক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সারাফত হোসাইন বলেন,দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই শিক্ষকের প্রকৃত দায়িত্ব। অন্যায়ের সাফাই গাওয়া মানে সমাজকে ভুল পথে ঠেলে দেওয়া।
এই আন্দোলনের মাধ্যমে যশোরের দুর্নীতি দমন কমিশনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। মানববন্ধনে দুদকের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়, যা রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে যশোর দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক আল-আমিন বলেন, আমরা শতভাগ প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করেছি। ঘুষের টাকা, সাক্ষ্য ও অন্যান্য আলামত আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই ঘটনায় একটি তদন্ত্র কমিটি হয়েছে তদন্ত্র প্রক্রিয়া চলমান। তিনি আরও বলেন, যদি কোনো মহল দুর্নীতিবাজকে রক্ষা করতে চায়, সেটি তাদের নৈতিক অবস্থানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই পুরো ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র যখন পদক্ষেপ নেয়, তখন সমাজের একটি অংশ সেই দুর্নীতিকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। এটি কখন কাম্য নয় ।
এদিকে ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের গঠিত তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি মাঠপর্যায়ের কাজ শেষ করেছে। কমিটির প্রধান ও অধিদপ্তরের যুগ্ম সচিব মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, আশরাফুল আলমের পক্ষে ও বিপক্ষে কয়েকশ আবেদন এবং অভিযোগকারীর বক্তব্য গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন অধিদপ্তরে জমা দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সময় শিক্ষা প্রশাসনের ভেতরে আত্মশুদ্ধি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার। নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নৈতিকতার পাঠ দেওয়ার অধিকার প্রশ্নের মুখে পড়বে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অভিযান চালিয়ে একজন শিক্ষিকার পেনশনের ফাইল ছাড় করার বিনিময়ে এক লাখ ২০ হাজার টাকা ঘুস গ্রহণের অভিযোগে আশরাফুল আলমকে হাতেনাতে আটক করে দুদক। অভিযোগকারী শিক্ষক মোহাম্মদ নুরুন্নবীর দাবি, দীর্ঘদিন ঘুরানোর পর ঘুস দিতে বাধ্য হয়ে তিনি দুদকের সহায়তা নেন। অন্যদিকে দুদক জানিয়েছে, তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আদালতের আদেশে আশরাফুল আলম বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।